শামছুল আরেফিন খান

বীরাঙ্গনা অর্পণা রায় চৌধূরি।।সামন্ত স্বার্থের তাবেদার সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী সরকারের এমন নির্মম দমন পীড়ন ও অমানবিক নারী দলনের আরও একটি নিষ্ঠূর নজীর সৃষ্টি হয় ‘নানকর বিদ্রোহ’ দমনে। সে ঘটনায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অমানুষিক ব্যাভিচারের শিকার হন নানকর বিদ্রোহের নেতা শ্রীমতি অপর্ণা রায় চৌধুরি। নানকর শব্দের বাংলা অর্থ হতে পারে- ‘ভাতের বদলে রক্তশোষণ’।যা দাশ প্রথারই নামান্তর। ক্ষুদ্রতম একখন্ড ভিটামাটি ও ন্যূনতম খোরাকি জমির বিনিময়ে ক্রীতদাশের মত স্ত্রীপুত্র কন্যাসহ ‘ চৌধুরি পদবীধারী মিরাশদারের’ সার্বক্ষণিক গোলাম ছিল নানকর কৃষক পরিবার।বৌবেটিরা ছিল ‘যখন-তখন’ ভূস্বামীর যৌন ক্ষুধা নিবৃত্তির উপাদান। নানকর প্রজা অর্থাৎ “কিরাণ-মাইমাল তথা চাষী ও মৎসজীবী, ধোপা নাপিত, মৃৎশিল্পি , মাঝি ও পালকিবাহক বেহারা প্রভৃতি শূদ্র শ্রেণির মানুষ” ছিল ব্রিটিশ ভারতে এই নিকৃষ্টতম জমিদারি শোষণের শিকার।অমানবিক সেই নানকর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সিলেট অঞ্চলে সার্বক্ষণিক বেগার খাটা দরিদ্র হাড্ডিসার মানুষগুলো চরম ক্ষোভ ও বিদ্রোহে ফেটে পড়েছিল ১৮জানুয়ারি ১৯৪৯।জমিদারের লাঠিয়াল ছিল মুসলিম লীগের পান্ডারা। পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী নিয়ে তারা ঝাপিয়ে পড়েছিল বিদ্রোহী নানকর কৃষকদের উপর। সেই হামলায় গুলিতে শহীদ হন ১.রজনী দাশ(৫০);২.ব্রজনাথ দাশ(৫০);৩. কুটুমনি দাশ (৪১);৪.প্রশান্ত কুমার দাশ(৫০);৫. পবিত্রকুমার দাশ (৪৫);ও ৬. অমূল্যকুমার দাশ (১৭)।সিলেটের বিয়ানি বাজার ছিল নানকর বিদ্রেহের প্রধান ঘাটি।পরে তা ছড়িয়ে পড়ে সুনামগঞ্জ অঞ্চলে। সেখান থেকে গোটা সিলেটে। তারপর সারা বাংলায়। নানকর বিদ্রোহের নেতা শ্রীমতি অপর্ণা চৌধুরি গ্রেফতার হন। পুলিশ হেফাজতে তিনিও ইলা মিত্রের মতই নির্মম পাশবিকতার শিকার হন। জমিদার গিন্নী অর্পনা চৌধুরি অন্তস্বত্তা ছিলেন। অত্যাচারের মুখে তৎক্ষনাৎ তার গর্ভপাত হয়। তবুও সরকারের লেলিয়ে দেয়া নরপশুর কবল থেকে নিষ্কৃতি মেলেনি তাঁর ।১৯৪৮ সালে অর্থমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরি পূর্ববাংলা আইন পরিষদে ইবিটিএ তথা জমিদারি উচ্ছেদ আইনের খসড়া বিল উত্থাপন করেন। কিন্তু সিলেক্ট কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-মুসলমান ২২ জমিদার সদস্য আড়াই বছর ঝুলিয়ে রেখেছিলেন বিলটি জমির সিলিঙ ও ক্ষতিপূরণ ইস্যূতে। নানকর বিদ্রোহের দাবানল সারা পূর্ব বাংলায় ছড়িয়ে পড়ায় ১৯৫০ সালে ২০০ বিঘা সিলিংসহ ১০ বছর মেয়াদে ক্ষতিপূরণ দেয়ার শর্তে জমিদারি উচ্ছেদ বিলটি পাশ হয়। আওয়ামি মু.লীগ সদস্যরা বিরুদ্ধে ভোট দেন।তাদের দাবি ছিল ১০০ বিঘা সিলিঙ ও বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ। প্রদেশব্যাপী নানকর বিদোহ ও তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ৪ জুলাই ১৯৪৯ আওয়ামি মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।২৪ এপ্রিল ১৯৫০ রাজশাহী জেলে গুলি চালিয়ে ইলামিত্রের সাথী কম্পরামসহ তেভাগা আন্দোলনের ৮ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। সরকার বিহারি গুন্ডাদের দিয়ে দাঙ্গা বাধায় । অবলীলায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ ,লুন্ঠন ও ভূমিগ্রাস চালানো হয় ।“মালাউন” নিধনের এই মহাযজ্ঞে নেতৃত্ব দেন খুলনার খানে সবুর, চট্রগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরি ও কুষ্টিয়ার শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও জেলা মহাকুমায় শাসকদলের লুটেরা নেতা কর্মীরা। সরকারি পুলিশ মিলিটারি ও টিকটিকিরা আওয়ামী লীগে শরীক হওয়া ২০ হাজার বামপন্থী নেতাকর্মীসহ লক্ষাধিক বাঙালিকে দেশছাড়া করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ।মুসলিম লীগের নেতা কর্মী ও গুন্ডারা হিন্দু নারী ও স্থাবর অস্থাবর সম্পদ মালেগনিমতের মত গ্রাস করে। দাঙ্গায় প্রাণ হারাণ পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ। নিরস্ত্র ব্যালট বিপ্লব ১৯৫৪ সালের ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে এই গণবিদ্রোহ, গণসংগ্রাম কৃষক আন্দোলনের ফসল গোলায় তুলেছিল হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট।ইতিহাসে লেখা আছে ব্যালট বিপ্লবের কথা।লেখা হয়নি তার পশ্চাতের অসামান্য সব কোরবানির কথা।পীর সাহেবরা ফতোয়া দিলেন, “মুসলিম লীগে ভোট না দিলে বিবি তালাক হয়ে যাবে”। তবুও মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঠেকানো গেলো না। ইতিহাস পড়লে মনে হয় , হক-ভাসানি- সোহরাওয়ার্দী জোট বাঁধলেন। আর ওমনি শাসকদল মুসলিম লীগ মুখ থুবড়ে পড়লো।কাক এসে বসতেই পাকা তালটা যেন টুপ করে মাটিতে পড়ে গেলো। এইটুকুই মানুষ জানলো। আসল গল্পটা হারিয়ে গেলো।ব্যালট বিপ্লবের শ্রেণী চরিত্র ১৯৫৪ সালের ব্যালট বিপ্লবেরও একটা শ্রেণি চরিত্র ছিল।আমার বিবেচনায় শ্রেণী চরিত্রের দিক দিয়ে সেটা ছিল সামন্তবাদ বিরোধী, মৌলবাদ বিরোধী,কৃষক বান্ধব, বাঙালি জাতিসত্বার মৌলিক চেতনা ঋদ্ধ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক বিপ্লব। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় বাংলা রাষ্ট্রভাষা ও কৃষকের তেভাগা দাবী পূরণ, সমবায় কৃষি প্রবর্তন ও বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ এর অঙ্গীকার তার স্বাক্ষর রেখেছে। ৫৫ সালে ৯২-ক ধারা ও অক্টোবর ‘৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ৫৪ সালের ব্যালট বিপ্লবের ফসল কেড়ে নিলো। সত্যি কথাতো এটাই যে, জনগনকে তার নায্য হিস্সা দেওয়া হলনা বলেই বিজয়ের ফসল হারিয়ে গেলো।কেউ বলেনি সে কথা। ফজলুল হক গোড়া থেকেই তেভাগার বিরোধী ছিলেন। তিনিই কূট কৌশল করে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দিলেন। যে গাছে তালটা পেকেছিল সেটার গোড়া কেটে দিলেন সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী । সজ্ঞানে অথবা অজ্ঞাতসারে তাঁরা দুজনে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ঐক্য ভেঙে দিলেন ১৯৫৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কাগমারি সম্মেলনে । এক বছরের মধ্যে দেশে সামরিক শাসন আসলো।কারারুদ্ধ শেখ মুজিবর রহমান, ১৯৫০ এপ্রিল, রাজশাহী জেলে পুলিশের গুলিতে নিহত তেভাগা আন্দোলনের নেতাদের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে ওয়াদা করেছিলেন, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে পূর্ব বাংলার কৃষক অবশ্যই তেভাগা পাবে। তিনি ’৫০জানুয়ারি মাসে ইলামিত্রকে দেখতে জেল হাসপাতালে যেয়ে বলেছিলেন , ‘দিদি তোমার ত্যাগ বৃথা যাবে না ‘। ‘৫৪ সালে তাঁকে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্যে ভারতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ১৯৭৫ জানুয়ারিতে তেভাগা দাবি মেনে নিয়ে নতুন কৃষি নীতি ঘোষণা করেছিলেন জাতির জনক। আর সেটাই তাঁর প্রাণ যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।পিছনে ফিরে দেখাসেই বীরাঙ্গনা ।১৯৫০ সালে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম যখন অঙ্কূরে সজীব হতে সচেষ্ট সে সময় বাংলার দুই ‘নারী সিংহ’ অসীম সাহসে লড়াই করে জাতির মনে সাহস যুগিয়েছিলেন। প্রজন্ম জানুক সে কথা। আমি তাদের কথাও বলতে চাই।সত্তর বছর আগের অখণ্ড ও পরাধীন ভারতের ঔপনিবেশিক শক্তির অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শনই ছিল শোষণ, অন্যায়, অবিচার। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দোসর হয়ে দেশীয় জোতদার-জমিদার-মহাজন নিজের দেশের গরিব অসহায় মানুষকে ক্ষুধার অন্ন থেকে বঞ্চিত করে এ কথা স্পষ্ট করেছিলেন যে শোষকের দেশভেদ নেই।স্বদেশী ও ভিন দেশীতে কোনও প্রভেদ নেই। এই স্বদেশি জোতদার-জমিদার-মহাজনের শত-শতাব্দীব্যাপী অত্যাচার আর শোষণের পরিণতিতে ঘটেছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, পঞ্চাশের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বাপের জমি হারিয়েছিল কৃষক। দাপের জমি বেড়েছিল জমিদারের । কৃষক হয়েছিল ভূমিহীন বর্গাদার। বাংলার ইতিহাস কৃষকের রক্ত-ঘাম-চোখের জলে সিঞ্চিত বেদনার ইতিহাস । আবার ইতিহাসই এ কথার সাক্ষী যে , লাঞ্ছিত , দলিত , বুভুক্ষু, সর্বহারা কৃষকসমাজ মেনে নেয়নি সেই অন্যায়, বঞ্চনা, অবিচার। রক্তাক্ত অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস ও বীরগাথায় রয়েছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ।ভারতের মুক্তি আন্দোলনের শেষ পর্বেও বাংলার মাটিতে ঘটেছিল এক অভূতপূর্ব কৃষক আন্দোলন যা তেভাগা সংগ্রাম নামে প্রসিদ্ধ। ১৯৪৬-৪৭ সালে তার সূত্রপাত। সংগঠক কৃষকসভা।তেভাগা আন্দোলনে মহিলাদের ছিল বিপুল অংশগ্রহণ । দিনাজপুরের সংগ্রামে রাজবংশী ও নমঃশূদ্র মহিলারা অসাধারণ সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন। অনেকে শহীদ হয়েছিলেন।তেভাগা আন্দোলন তেভাগার গৌরবজনক সংগ্রামে কাকদ্বীপের নাম স্মরণীয়। বুধাখালি থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত করেন গজেন মালী নামের এক সাহসী কৃষকনেতা। সুন্দরবনের অনুন্নত, উপেক্ষিত দ্বীপ নিয়ে অমর হয়ে রয়েছে সুকান্ত ভট্টাচার্য বিরচিত ‘দুর্মর’ কবিতাটি। সুকান্ত লিখলেন, “এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে/সোনালি নয়কো, রক্তে রঙিন ধান,/দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে/ দাউ দাউ করে বাংলা দেশের প্রাণ”আজ থেকে সত্তর বছর আগে সংগঠিত ও সংঘটিত তেভাগা সংগ্রামের কিংবদন্তীসম নেতার নাম রাণীমা ইলামিত্র। যশোর ঝিনেদার মেয়ে, কলকাতার বিশ্বমানের এথলেট ইলা সেন। রাজশাহীর পুত্রবধূ ইলামিত্র। মানবতাবাদী ইলামিত্রই সেই অনণ্যা নারী সাহসিকা , যিনি সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বেচ্ছায় জীবনের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন। নিগ্রীহিত হয়েছেন অমানুষিক পীড়ন নির্যাতনে । অবর্ণণীয় পাশবিক ব্যাভিচারে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত ও জর্জরিত হয়েছেন। রাজনৈতিক কারণে একজন সংগ্রামী নারীর উপর ব্রিটিশ আমলেও এমন পাশবিক নিরযাতন হয়নি কখনও।১৯৪২ সালে এ দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন কৃষকদের উপর শোষণের মাত্রা বেড়ে যায়। কৃষকের ঘর থেকে সব খাদ্য কেড়ে নিয়ে যায় ব্রিটিশ তাদের সেনা বাহিনীর জন্যে। ১৯৩৯ সালে মহাযুদ্ধ শুরু হ’ল। কৃষকের পিঠ ঠেকে গেলো দেয়ালে। কৃষক ঘুরে দাড়াল । শুরু হ’ল ‘তিন ভাগের দুইভাগ ফসল’ এর জন্য কৃষকের আন্দোলন। তারই ধারাবাহিকতায় ‍ উত্তাল হয়েছিল পূর্ব বাংলার কৃষক। পাকিস্তান সরকারের দমন নীতির কারণে কৃষক আন্দোলনের নেতারা আত্ম গোপন করেন। ইলা মিত্র এবং তাঁর স্বামী রমেন্দ্র মিত্রও নাচোলের চন্ডিপুর গ্রামে আত্মগোপন করেছিলেন। এই গ্রামে ছিল সাঁওতাল নেতা ও প্রথম সাঁওতাল কমিউনিস্ট মাতলা মাঝির বাড়ি।তেভাগা আন্দোলন দুর্বার হয়ে ওঠে। কৃষকের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে আপাতভাবে তেভাগা কার্যকর করা হলে ভূমি মালিকরা থেমে থাকেনি। সরকারের আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী নানাভাবে কৃষকদের ওপর অত্যাচার নিপীড়ন অব্যাহত রেখেছিল। সংঘাত চলতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তা ও ৫ জন কনেস্টবল নিহত হয় আন্দোলনকারিদের হাতে। এর পরই শুরু হয় পুলিশ ও সৈন্যদের অত্যাচার নিপীড়ন।জমিদার বাড়ির গৃহবধূ হয়েও ইলা মিত্র স্বামীর সহায়তায় খুব দ্রুত হয়ে ওঠেন স্থানীয় কৃষক সম্প্রদায়ের নেত্রী। স্বামী রমেন্দ্র মিত্র ছিলেন একজন মুক্ত মনের স্বাধীনচেতা মানুষ। ফ্লোড কমিশন রিপোর্ট বাস্তবায়ন এবং কৃষকদের জমি ভাগাভাগির বিষয় দু’টি নিয়ে পুরো দেশ তখন সরকার বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল। নাচোলের কৃষকরাই ছিল আন্দোলনের পুরোভাগে। এই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিল সাঁওতালরা। সেই আন্দোলনই আজ ইতিহাসে ‘নাচোল বিদ্রোহ’, ‘তেভাগা আন্দোলন’ বা ‘নাচোলের কৃষক আন্দোলন’ নামে পরিচিত। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন ইলা মিত্র। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি পুলিশ ও কৃষকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এরই জের ধরে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার দুই দিন পর নাচোলে প্রায় ২ হাজার সেনা প্রেরণ করে “শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য”। কিন্তু সেনারা ওই এলাকায় ব্যাপক মারপিট করে এবং গুলি করে শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করে । জ্বালিয়ে দেয় ১২ টি গ্রামের কয়েক’শ বাড়ি-ঘর। এদের বেশীরভাগই ছিল সাঁওতাল অধিবাসী। পাকিস্তানি সৈন্য এবং পুলিশের অত্যাচারে প্রতিটি পরিবারের সকল সদস্যই তখন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। ইলা মিত্রও সাঁওতালদের পোশাক পরে লড়াইর ময়দান ত্যাগ করেন।। পোষাক পরিবর্তন করলেও ভাষাগত কারণে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ইলা মিত্র তাঁর এক’শ অনুসারিসহ গ্রেফতার হন রহনপুর থেকে।নাচোল থানায় তাঁর উপর চলে অমানুষিক পুলিশী নির্যাতন। প্রথম ধাপে টানা চার দিন ধরে চলে এই অত্যাচার । প্রচন্ড জ্বর এবং রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ হাসপাতালে। জানুয়ারি মাসের ২১ তারিখে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে তাঁকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আর সেখানেই শুরু হয় নির্যাতনের দ্বিতীয় ধাপ।ইলামিত্রের জবানবন্দী এই নির্যাতন সম্পর্কে ইলা মিত্র রাজশাহী আদালতে যে ঐতিহাসিক জবানবন্দী দিয়েছিলেন তা ছিল এরকম : “কেসটির ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। বিগত ৭ জানুয়ারি ১৯৫০ তারিখে আমি রহনপুরে গ্রেফতার হই এবং পরদিন আমাকে নাচোল নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার পথে পুলিশ আমাকে মারধর করে এবং তারপর আমাকে একটা সেলের মধ্যে নিয়ে যায়। পুলিশ হত্যাকান্ড সম্পর্কে সবকিছু স্বীকার না করলে আমাকে উলঙ্গ করে দেওয়া হবে বলে একজন এস আই আমাকে হুমকি দেয়। আমার বলার মত কিছু ছিল না। কাজেই তারা আমার সমস্ত কাপড়-চোপড় ওরা খুলে নেয় এবং সম্পূর্ণ উলঙ্গভাবে সেলের মধ্যে আমাকে বন্দী করে রাখে। আমাকে কোন খাবার দেয়া হয়নি। এক বিন্দু জলও না। সেদিন সন্ধ্যায় সেই এস আইর উপস্থিতিতে সেপাইরা তাদের বন্দুকের বাঁট দিয়ে আমার মাথায় আঘাত শুরু করে।…তারা অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এস আই সেলে চারটে গরম সিদ্ধ ডিম আনার হুকুম দিল। তারপর চার-পাঁচজন সেপাই আমাকে জোরপূর্বক ধরে চিৎ করে শুইয়ে দিলো এবং একজন আমার যৌনাঙ্গের ভিতর একটা গরম ডিম ঢুকিয়ে দিল। আমি আগুনে পুড়ে যাচ্ছিলাম। এর পর আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। ৯ জানুয়ারি ১৯৫০ সকালে যখন আমার জ্ঞান হলো তখন উপরোক্ত এস আই এবং কয়েকজন সেপাই আমার সেলে এসে তাদের বুট দিয়ে চেপে আমাকে লাথি মারতে শুরু করল। এর পর আমার ডান পায়ের গোড়ালিতে একটা পেরেক ফুটিয়ে দেওয়া হলো। সেই সময় আধাচেতন অবস্থায় পড়ে থেকে আমি এস আইকে বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম, আমরা আবার রাত্রিতে আসছি এবং তুমি যদি স্বীকার না কর তাহলে সিপাইরা একে একে তোমাকে ধর্ষণ করবে। গভীর রাতে এস আই এবং সেপাইরা ফিরে এলো এবং তারা আবার সেই একই হুমকি দিল। কিন্তু যেহেতু তখনো কিছু বলতে রাজি হলাম না তাই তিন-চারজন আমাকে ধরে রাখল এবং একজন সেপাই সত্যি সত্যি ধর্ষণ করতে শুরু করল। এর অল্পক্ষণ পরই আমি জ্ঞান হারালাম। পরদিন ১০ জানুয়ারি যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো তখন আমি দেখলাম যে, আমার দেহ থেকে দারুণভাবে রক্ত ঝরছে এবং কাপড়-চোপড় রক্তে সম্পূর্ণ ভিজে গেছে।”নারীর উপর রাষ্ট্রীয় দলন রাষ্ট্রের সমর্থন ও অনুমোদন না থাকলে প্রশাসনযন্ত্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে এমন নির্মম নিষ্ঠূর নারীদলন ঘটতে পারতো না। একথা বুঝতে পূর্ব বাংলার মানুষকে কোন অভিধান ঘাটতে হয়নি। তখন কোন সামরিক শাসন ছিল না। দেশ চালাচ্ছিল মুসলিম লীগ।অখণ্ড বাংলায় মাত্র ৪ বছর আগে ,১৯৪৬ এর পৃথক নির্বাচনে ,সর্বোচ্চ মুসলিম ভোট পেয়েছিল তারা । সারা ভারতে বাংলার মুসলিম বাঙালিরাই পাকিস্তান ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি ভোট দিয়েছিল মুসলিম লীগকে।“মানুষের ব্যবহার বলে দেয় তার বংশ পরিচয়।কর্মে যোগ্যতা এবং বচনে মেলে জ্ঞানের পরিমাপ”। কৃষক স্বার্থ বিরোধী মুসলিম লীগের আচরণে প্রকাশ পেয়েছে তার শ্রেণী পরিচয়। বীরাঙ্গনা অর্পণা রায় চৌধূরি সামন্ত স্বার্থের তাবেদার সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী সরকারের এমন নির্মম দমন পীড়ন ও অমানবিক নারী দলনের আরও একটি নিষ্ঠূর নজীর সৃষ্টি হয় ‘নানকর বিদ্রোহ’ দমনে। সে ঘটনায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অমানুষিক ব্যাভিচারের শিকার হন নানকর বিদ্রোহের নেতা শ্রীমতি অপর্ণা রায় চৌধুরি। নানকর শব্দের বাংলা অর্থ হতে পারে- ‘ভাতের বদলে রক্তশোষণ’।যা দাশ প্রথারই নামান্তর। ক্ষুদ্রতম একখন্ড ভিটামাটি ও ন্যূনতম খোরাকি জমির বিনিময়ে ক্রীতদাশের মত স্ত্রীপুত্র কন্যাসহ ‘ চৌধুরি পদবীধারী মিরাশদারের’ সার্বক্ষণিক গোলাম ছিল নানকর কৃষক পরিবার।বৌবেটিরা ছিল ‘যখন-তখন’ ভূস্বামীর যৌন ক্ষুধা নিবৃত্তির উপাদান। নানকর প্রজা অর্থাৎ “কিরাণ-মাইমাল তথা চাষী ও মৎসজীবী, ধোপা নাপিত, মৃৎশিল্পি , মাঝি ও পালকিবাহক বেহারা প্রভৃতি শূদ্র শ্রেনীর মানুষ” ছিল ব্রিটিশ ভারতে এই নিকৃষ্টতম জমিদারি শোষণের শিকার।অমানবিক সেই নানকর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সিলেট অঞ্চলে সার্বক্ষণিক বেগার খাটা দরিদ্র হাড্ডিসার মানুষগুলো চরম ক্ষোভ ও বিদ্রোহে ফেটে পড়েছিল ১৮জানুয়ারি ১৯৪৯।জমিদারের লাঠিয়াল ছিল মুসলিম লীগের পান্ডারা। পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী নিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বিদ্রোহী নানকর কৃষকদের উপর। সেই হামলায় গুলিতে শহীদ হন ১.রজনী দাশ(৫০);২.ব্রজনাথ দাশ(৫০);৩. কুটুমনি দাশ (৪১);৪.প্রশান্ত কুমার দাশ(৫০);৫. পবিত্রকুমার দাশ (৪৫);ও ৬. অমূল্যকুমার দাশ (১৭)।সিলেটের বিয়ানি বাজার ছিল নানকর বিদ্রেহের প্রধান ঘাটি।পরে তা ছড়িয়ে পড়ে সুনামগঞ্জ অঞ্চলে। সেখান থেকে গোটা সিলেটে। তারপর সারা বাংলায়। নানকর বিদ্রোহের নেতা শ্রীমতি অপর্ণা চৌধুরি গ্রেফতার হন। পুলিশ হেফাজতে তিনিও ইলা মিত্রের মতই নির্মম পাশবিকতার শিকার হন। জমিদার গিন্নী অর্পনা চৌধুরি অন্তস্বত্তা ছিলেন। অত্যাচারের মুখে তৎক্ষনাৎ তার গর্ভপাত হয়। তবুও সরকারের লেলিয়ে দেয়া নরপশুর কবল থেকে নিষ্কৃতি মেলেনি তাঁর ।১৯৪৮ সালে অর্থমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরি পূর্ববাংলা আইন পরিষদে ইবিটিএ তথা জমিদারি উচ্ছেদ আইনের খসড়া বিল উত্থাপন করেন। কিন্তু সিলেক্ট কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু-মুসলমান ২২ জমিদার সদস্য আড়াই বছর ঝুলিয়ে রেখেছিলেন বিলটি জমির সিলিঙ ও ক্ষতিপূরণ ইস্যূতে। নানকর বিদ্রোহের দাবানল সারা পূর্ব বাংলায় ছড়িয়ে পড়ায় ১৯৫০ সালে ২০০ বিঘা সিলিংসহ ১০ বছর মেয়াদে ক্ষতিপূরণ দেয়ার শর্তে জমিদারি উচ্ছেদ বিলটি পাশ হয়। আওয়ামি মু.লীগ সদস্যরা বিরুদ্ধে ভোট দেন।তাদের দাবি ছিল ১০০ বিঘা সিলিঙ ও বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ। প্রদেশব্যাপী নানকর বিদোহ ও তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ৪ জুলাই ১৯৪৯ আওয়ামি মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।২৪ এপ্রিল ১৯৫০ রাজশাহী জেলে গুলি চালিয়ে ইলামিত্রের সাথী কম্পরামসহ তেভাগা আন্দোলনের ৮ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। সরকার বিহারি গুন্ডাদের দিয়ে দাঙ্গা বাধায় । অবলীলায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ ,লুন্ঠন ও ভূমিগ্রাস চালানো হয় ।“মালাউন” নিধনের এই মহাযজ্ঞে নেতৃত্ব দেন খুলনার খানে সবুর, চট্রগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরি ও কুষ্টিয়ার শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্রলীগর সাবেক নেতা ও জেলা মহাকুমায় শাসকদলের লুটেরা নেতা কর্মীরা। সরকারি পুলিশ মিলিটারি ও টিকটিকিরা আওয়ামি লীগে শরীক হওয়া ২০ হাজার বামপন্থী নেতাকর্মীসহ লক্ষাধিক বাঙালিকে দেশছাড়া করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ।মুসলিম লীগের নেতা কর্মী ও গুন্ডারা হিন্দু নারী ও স্থাবর অস্থাবর সম্পদ মালেগনিমতের মত গ্রাস করে। দাঙ্গায় প্রাণ হারাণ পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ। নিরস্ত্র ব্যালট বিপ্লব ১৯৫৪ সালের ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে এই গণবিদ্রোহ,গণসংগ্রাম কৃষক আন্দোলনের ফসল গোলায় তুলেছিল হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট।ইতিহাসে লেখা আছে ব্যালট বিপ্লবের কথা।লেখা হয়নি তার পশ্চাতের অসামান্য সব কোরবানির কথা।পীর সাহেবরা ফতোয়া দিলেন, “মুসলিম লীগে ভোট না দিলে বিবি তালাক হয়ে যাবে”। তবুও মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঠেকানো গেলোনা। ইতিহাস পড়লে মনে হয় , হক-ভাসানি- সোহরাওয়ার্দী জোট বাঁধলেন। আর ওমনি শাসকদল মুসলিম লীগ মুখ থুবড়ে পড়লো।কাক এসে বসতেই পাকা তালটা যেন টুপ করে মাটিতে পড়ে গেলো। এইটুকুই মানুষ জানলো। আসল গল্পটা হারিয়ে গেলো।ব্যালট বিপ্লবের শ্রেণি চরিত্র ১৯৫৪ সালের ব্যালট বিপ্লবেরও একটা শ্রেণী চরিত্র ছিল।আমার বিবেচনায় শ্রেণী চরিত্রের দিক দিয়ে সেটা ছিল সামন্তবাদ বিরোধী,মৌলবাদ বিরোধী,কৃষক বান্ধব, বাঙালি জাতিসত্বার মৌলিক চেতনা ঋদ্ধ জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক বিপ্লব। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায় বাংলা রাষ্ট্রভাষা ও কৃষকের তেভাগা দাবী পূরণ, সমবায় কৃষি প্রবর্তন ও বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ এর অঙ্গীকার তার স্বাক্ষর রেখেছে। ৫৫ সালে ৯২-ক ধারা ও অক্টোবর ‘৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ৫৪ সালের ব্যালট বিপ্লবের ফসল কেড়ে নিলো। সত্যি কথাতো এটাই যে, জনগণকে তার নায্য হিস্সা দেওয়া হলনা বলেই বিজয়ের ফসল হারিয়ে গেলো।কেউ বলেনি সে কথা। ফজলুল হক গোড়া থেকেই তেভাগার বিরোধী ছিলেন। তিনিই কূট কৌশল করে যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দিলেন। যে গাছে তালটা পেকেছিল সেটার গোড়া কেটে দিলেন সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী । সজ্ঞানে অথবা অজ্ঞাতসারে তাঁরা দুজনে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক ঐক্য ভেঙে দিলেন ১৯৫৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কাগমারি সম্মেলনে । এক বছরের মধ্যে দেশে সামরিক শাসন আসলো।কারারুদ্ধ শেখ মুজিবর রহমান, ১৯৫০ এপ্রিল, রাজশাহী জেলে পুলিশের গুলিতে নিহত তেভাগা আন্দোলনের নেতাদের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে ওয়াদা করেছিলেন, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে পূর্ব বাংলার কৃষক অবশ্যই তেভাগা পাবে। তিনি ’৫০ জানুয়ারি মাসে ইলামিত্রকে দেখতে জেল হাসপাতালে যেয়ে বলেছিলেন , ‘দিদি তোমার ত্যাগ বৃথা যাবে না ‘। ‘৫৪ সালে তাঁকে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার জন্যে ভারতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ১৯৭৫ জানুয়ারিতে তেভাগা দাবি মেনে নিয়ে নতুন কৃষি নীতি ঘোষণা করেছিলেন জাতির জনক। আর সেটাই তাঁর প্রাণ যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।উটের দাম এক টাকা তেভাগার গল্পের সাথে “উটের দাম একটাকা” গল্পটার দারুণ মিল রয়েছে। “ ক্রেতা জিজ্ঞেস করলেন, বাপু তোমার উটের দাম কত? বিক্রেতা বললে , হুজুর মাত্র এক টাকা। ক্রেতা বললেন,বড়ই তাজ্জবকা বাত! বহৎ খুউব ! দিলাম টাকা । দাও উট। বিক্রেতা বললেন – গোস্তাকি মাফ হুজুর, শানে নজুলে একটু গওর করুন। উটের লেজে বাঁধা রয়েছে যে বিড়ালটা দেখছেন সেটার দাম মাত্র একশত টাকা । এটা নিলে ওটাও নিতে হবে। ওরা মানিকজোড় হুজুর। ওরা বাঁচবেও একসাথে । মরবেও এক সাথে।” বঙ্গবন্ধু সেই জটিল অঙ্কেরও একটা সমাধান দিলেন। বললেন,জমির মালিকানা রাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করবে না। সবাই সমবায় সমিতির সদস্য হবে। ফসলের একভাগ কৃষক পাবে তার শ্রমের মজুরি বাবদ, একভাগ পাবে জমির মালিক। জমিতে শ্রম দিলে সেও মজুরি পাবে। আর একভাগ পাবে সমিতি উপকরণের জন্যে।রাষ্ট্র সুবিধা দেবে সমিতিকে। সবাই তার ফায়দা পাবে। কিন্তু তাতেও কাজ হ’লনা। তিনি পরিবার শুদ্ধ প্রাণ দিলেন । শ্রমিক – কৃষক তেভাগা পেলো না।১৯৬৪ সালে দাঙ্গা প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সিনিয়ার মন্ত্রী খুলনার নষ্টমানুষ খান এ সবুর খান মাত্র ৩০ বিঘা হিন্দু জমি আত্মসাতের জন্যে আবার দাঙ্গা বাধালেন ১৯৬৪ সালে । সেই দাঙ্গায় বরিশালের গৌড়নদী এলাকায় একজন জনপ্রিয় স্কুল শিক্ষককে তার কতিপয় ছাত্রই হাতপা বেঁধে কেরোসীন ঢেলে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর‌্যন্ত তারা “পাগড়ি পরে পাশবিক উল্লাসে আরবী গান গেয়ে” তার চিতা প্রদক্ষিণ করতে থাকে।মুসলিম লীগ এভাবে ব্যালট বিপ্লবে অর্জিত বাঙালির বিজয় কেড়ে নিলেও তার অন্তঃসার যে স্বাধিকার চেতনা তাকে হরণ করতে পারেনি। সেই অনশ্বর চেতনা অন্তরে ধারণ করেই ’৭০ সালে আরও একধাপ এগিয়ে নতুন করে আবার ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে স্বশাসনের পক্ষে নিরঙকুশ রায় ঘোষণা করলো বাংলার আপামর জনগন।উপসংহার গণতন্ত্রের জন্য নিবেদিত বাঙালি ১৯৪৬ এর নির্বাচনের সময় “ইয়ে আজাদী ঝুটা হায় , লাখো ইনসাস ভুখা হায়” স্লোগান ও লালঝান্ডার বিপ্লবী হাতছানি ও অখণ্ড বাংলার দাবি পরিহার করে গণতন্ত্রের অঙ্গীকার ও আশ্বাসের উপর আস্থা রেখেছিল। পূর্ব বাংলার বৈষম্য দলিত বঞ্চিত জনগণ সমস্ত অতিবিপ্লবী রণহুঙ্কার প্রত্যাখ্যান করে ’৭০ সাল পর‌্যন্ত গনতন্ত্রকে আঁকড়ে ধরে সমাধান খুজেছিল । একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানের স্বৈরাচারি সামরিক সরকার গণতন্ত্রের বাতাবরণ কেড়ে নিয়ে আপোষহীন বাঙালিকে যুদ্ধের লেলিহান আগুনে নিক্ষেপ করলো। সে আগুন এখনও নেভেনি। যুদ্ধ থেমেও থামেনি। সময় বদলেছে।পরিস্থিতির কিঞ্চিৎ পরিবর্তন ঘটেছে।কুশিলব বদলে গেছে । যুদ্ধের রঙ বদলে গেছে। একাত্তরে যারা সংগ্রামী বাঙালির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গুলি ছুড়েছিল আজ তারাই অন্তরাল থেকে বিজয়ী বাঙালির উপর, নানা অঙ্গনে ঘাপটিমেরে থেকে গুলি নিক্ষেপ করছে। সামন্তবাদী স্বার্থের ক্রীড়নক ও সাম্রাজ্যবাদের সেবাদাশ মৌলবাদীরাই ছিল বাঙালির সব থেকে বড় দুশমন। তাদের বর্শা ফলকের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল দুটি,-১. হিন্দু ও ২. নারী। প্রধান শত্রু ছিল কৃষক শ্রমিক বুদ্ধিজীবী। সময়ের ব্যবধানে মৌলবাদ রূপান্তরিত হয়েছে জঙ্গীবাদে। একাত্তর থেকে ৪৭ বছর পরেও হিন্দু নিধন ও নারী দলনের মহাযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে। ফেনীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার মত শতেক ঘাটিতে চলছে নারী জীবন ও সম্ভ্রমের নীরব সংহার। ২৫ মার্চ ৭১ কালোরাত থেকে শুরু হওয়া হিন্দু নিধনযজ্ঞের “৯৮ ভাগ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে” বলে দাবি করেছেন স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তির শিবিরে ঘাপটি মেরে থাকা একজন তথাকথিত ওলেমা নেতা। সাম্প্রতিককালে এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন “…কাজে কাজেই রাষ্ট্রধর্মের বাতাবরণে ব্লাসফেমী আইন পাশকরে শরীয়া চালু করতে এখন আর কোন বাধা থাকলো না”। কিন্তু নারীপ্রগতিকে ঘরের আঙ্গিনা ও “ ফোর ক্লাশ” শিক্ষার বেড়ায় আটকে রাখা যায়নি। একমাত্র পোষাক শিল্পেই ৫০ লক্ষ নারী কর্মযজ্ঞে নিবেদিত রয়েছে। উচ্চশিক্ষায় ৫০ শতাংশের কোটা ছাড়িয়ে নারী এখন পুরুষের আগে ছুটছে। নারী প্রগতি ও নারীর ক্ষমতায়ন তাই এ সময় মৌলবাদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও “আইএস” এর প্রধান টার্গেট প্রগতিমনা নারী।২৫ মার্চ রাতে শাখারি পট্টি , শাখারি বাজার , রায় বাজার , জিঞ্জিরা ,জগন্নাথ হল ইকবাল হলের সঙ্গে রোকেয়া হলেও হানা দিয়েছিল পাকিস্তানী জল্লাদরা। ২৬-২৭ মার্চ রাতে রোকেয়া হল থেকে ৩০০ শিক্ষার্থী মেয়েকে জবরদস্তি তুলে নিয়ে গিয়েছিল সদলবলে একজন পাকিস্তানী মেজর। ১৬ ডিসেম্বরের আগে তাদের খুজে পাওয়া যায়নি।১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পরযন্ত ,মুসলিম লীগের তৈরি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ মদদ ও অংশ গ্রহণে সম্পন্ন হয়েছিল যে নারী নির্যাতন ও নারী দলন তার সাথে একাত্তরের নারকীয় নারী সংহারের গুননগত কোন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না।পার্থক্য শুধু পরিমাণগত।২০১৮ সালের বিদেশী গবেষকরা সে সময়কার সমস্ত তথ্য প্রতিবেদন নিবিড় পর্যালোচনায় নিয়ে বলেছেন একাত্তরের হানাদার বাহিনী ও তাদের তল্পীবাহকদের নির্মমতায় সম্ভ্রম হারানো বাংলার জায়াজননী কন্যার সংখ্যা ৪(চার) লক্ষ বললেও কম বলা হবে।কোন কোন গবেষণা বলছে, একাত্তরে সম্ব্রমচ্যূত নারীর সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে।আন্তর্জাকি অঙ্গনে বিগত ১০০ বছরের তথ্য পরযালোচনায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সমূহের অলিন্দে প্রকোষ্ঠে যৌন সন্ত্রাসের যে ব্যাপকতা পরিলক্ষিত হয়েছে তাতে সভ্যতার মাথা হেঁট হয়েছে।ইউরোপের ধর্মযাযকরা বহুলাংশে সেই অনপনেয় কলঙ্কে মুখ কালো করেছে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একাত্তরের ধর্মের লেবাজপরা যৌন সন্ত্রাসীদের জার্মানীর হিটলার বা কম্পুচিয়ার পলপটের অস্ত্র দিয়ে নির্মূল করা হয়নি। সেটাকেই ইতিহাস এখন একাত্তরের সবচেয়ে বড় ভুল বলে রায় দিলে আমি বিস্মিত হবো না। আর সেই ভুলের কারণেই প্রশাসনের খাজে খাজে একাত্তরের হন্তারক ধর্ষকদের রক্তবীজ গীজ গীজ করছে। নববর্ষের উৎসব মেলায় তারা আবার যেন ছড়িয়ে না পড়ে। বুড়ো খোকা যেন সিং ভেঙে বাছুরের দলে না ঢোকে। সেটা দেখতে স্বাধীনতাযুদ্ধের বাহাদূর পলিশের উত্তর সূরীদের অনুরোধ জানাই।

১৩ এপ্রিল ২০১৯, যুক্তরাষ্ট্র।

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *