মাসউদুল হক


এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর যে বিষয়গুলি আমাকে এখনও মুগ্ধ করে তার একটি হলো প্রেম। প্রেম সিদ্ধ না অসিদ্ধ, প্রকৃত না ঠুনকো, গভীর না অগভীর- সেই প্রশ্নে আমি কখনও যাই না। প্রেম মাত্রই আমার কাছে মনোমুগ্ধকর একটা বিষয়। মিলিকে আমি যেসব কারণে ভালবাসতাম তার মধ্যে অন্যতম একটি কারন ছিল পশু-পাখির প্রতি মিলির প্রেম। মিলির সাথে পরিচয়ের কিছুদিন পর আমি যখন আবিষ্কার করলাম মিলির মধ্যে প্রবল পশুপ্রেম তখন আমি প্রেমটাকেই দেখেছিলাম। পশুটাকে নয়। মিলি যখন কোন ডানাভাংগা পাখি কিংবা কোন পা-ভাঙ্গা কুকুরের কষ্টের গল্প বলত তখন আমি সেই পাখি কিংবা কুকুরটিকে দেখতাম না। দেখতাম অসহায় প্রানীগুলোর প্রতি মিলির অন্ধপ্রেমটাকে। মনে আছে, মিলিদের বাসার এ্যাকুরিয়ামে অনেকদিন থাকার পর একটা গোল্ডফিস মৃত্যুর আগে কেমন করে বারবার উল্টে গিয়ে ভেসে উঠত, আবার খানিকটা শক্তি সঞ্চয় করে পুনরায় সোজা হয়ে সাঁতার কাটতে চেষ্টা চালিয়ে যেত – সেই দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে মিলির গাল বেয়ে চোখের জল নেমে এসেছিল। সেই জল আমাকে এতটাই ব্যাকুল করেছিল যে মিলিকে জড়িয়ে ধরে আমিও কেঁদে ওঠেছিলাম। মনে হয়েছিল, ছোট্টএকটা গোল্ডফিসের প্রতি যে মানুষটির এত মমতা সেই মানুষটাকে ভাল না বেসে থাকা যায় না।
যদিও আমি বিশ্বাস করি, পশু-পাখির প্রতি মানুষেরএইসব প্রেম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একপাক্ষিক হয়।একমাত্র কুকুর ছাড়া আর কোন পশু-পাখি মানুষের ভালবাসা অনুভব করে কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। আমরা যতই ভালবাসি না কেন, এ্যাকুরিয়ামে থাকা একটা মাছ কোনদিনই আমাদেরকে চিনে ওঠতে পারে না। খাঁচার দুয়ার খোলা পেলে টিয়া হোক কিংবা কথা বলা ময়নাই হোক কেউই আমাদের জন্য অপেক্ষা করে না। এমনকি নিয়মিত খাদ্যের যোগান না পেলে কুকুরও মানুষের প্রতি দিনের পর দিন আনুগত্য ধরেরাখবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না। তারপরও মিলির ঐ পশুপ্রেমকে আমি প্রশ্রয় দিতাম। যে প্রেমে প্রত্যাশা থাকে সেই প্রেম আমাকে মুগ্ধ করে কম। কিন্তু প্রত্যাশাহীন প্রেম আমাকে অলৌকিক আনন্দ দেয়। কিছুই দেবার নেই তেমন পশু-পাখির প্রতি মানুষের প্রেম দেখলেও আমি অলৌকিক আনন্দ পাই। মিলি যখন সুন্দর একটা তোতা কিংবা এক জোড়া খোরগোশের দুষ্টামির গল্প বলতো তখন তার চোখে-মুখে একটা উজ্জ্বল আভা ফুটে ওঠতো। আমি মুগ্ধ হয়ে সেই গল্প শুধু শুনতামই না, দেখতামও। কোন পশুর করুণ পরিনতির গল্প বলার সময় ওর মুখে যে বেদনার অভিব্যক্তি ফুটে ওঠতো তা আমাকেও স্পর্শ করে যেত।
একবার মিলির দেয়া সময় মেনে আমি ধানমন্ডি’র একটা কফি হাউসে বসে ছিলামকিন্তু মিলির কোন খোঁজ নেই। মোবাইলে একাধিকবার ফোন করেও মিলিকে ধরতে পারছিলাম না। আমি ঠিক বুঝে ওঠতে পারছিলাম না মিলির সমস্যাটি কি? প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করার পর আমি যখন উঠি উঠি করছি তখনমিলি মেসেজ করে আমাকে জানায়, ‘আরেকটু ওয়েট করো। আমি আসছি।’
ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সময়নিষ্ঠ মিলির সেদিন দেরি হয়েছিল জানালার কার্ণিশে আশ্রয় নেয়া একটা মুমূর্ষু চড়াইকে সুস্থ্য করতে গিয়ে। আমাকে অপেক্ষায় রেখে মিলি একজন পশু চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করেছিল। তার কাছ থেকে ঔষধের নাম নিয়ে, সেই ঔষধ জোগাড় করে, পাখিটিকে খাইয়ে তারপর আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। একটা ছোট পাখির সাথে আমি প্রেমিকের অপেক্ষার তুলনা করে কষ্ট পাইনি।বরং একটা তুচ্ছ প্রাণীর বেদনাকেও মিলি যে অগ্রাহ্য করেনি তা ভেবে আমি তৃপ্ত হয়েছিলাম।
আরেকবার রিকশায় চড়ে গ্রীনরোড থেকে বসুন্ধরার সিনেপ্লেক্সে যাচ্ছি, ‘মনপুরা’ দেখবো বলে। যাবার পথে দেখলাম, এক দল শিশু ছোট্ট একটা কুকুর শাবকের গলায় দড়ি বেঁধে টানছে। শাবকটির ছিল সাদা শরীরের ওপর বড় বড় লাল ছোপ। সমুদ্রকে সাদা ভাবলে আর ঐ লাল-লাল ছোপগুলোকে বিভিন্ন মহাদেশ ভাবলে কুকুরটিকে মানচিত্রে মোড়ানো একটা শাবক বলে চালিয়ে দেয়া যেত। পশ্চিমা কোন দেশে জন্ম নিলে হয়তো কুকুরশাবকটিকে পোষ্য নেয়ার জন্য হিড়িক পড়ে যেত। কিন্তু বাংলাদেশে জন্ম নেয়ায় গলায় দড়ির টান খাওয়া ছাড়া কুকুর শাবকটির আর কিছুই করার ছিল না। তবে কেন যেন কুকুর শাবকটি মানবশিশুদের নিষ্ঠুরতা মেনে নিতে চায়নি। সে বারবার চার’পা শক্ত করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল। এত ছোট এবং মোটামুটি নিরীহগোত্রের একটা পশুর এই প্রতিবাদ শিশুদের কাছে ঔদ্ধত্য বলে মনে হয়েছিল। শারীরিক সক্ষমতায় অনেক এগিয়ে থাকা শিশুরা টেনে-হেঁচড়ে শাবকটিকে নিয়ে যাচ্ছিল। গলায় দড়ির টান আর কংক্রিটের ফুটপাতে পায়ের ঘর্ষণের কারণে ব্যথায় খুব মৃদু স্বরে কু-কু ধরনের একটা করুন শব্দ করছিল কুকুরশাবকটি। মানুষের মতো কুকুরদেরও যে আপোষ করেই চলতে হয় তা হয়তো তখনও শিখে ওঠেনি শাবকটি।
যে দেশের শিশুদের কাছে একটা প্লাস্টিকের খেলনার চেয়ে জীবন্ত কুকুরের ছানা অনেক সহজলভ্য সে দেশের পথে-ঘাটে এমন একটি খেলা দেখে আমি কিংবা আর সব পথচারিরা কোন অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাইনি। কিন্তু মিলি সেই সাধারণ নিষ্ঠুরতাকে মেনে নিতে পারেনি। রিকশা থামিয়ে সে শিশুদের সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। প্রতিদিন নানারকম নিষ্ঠুরতা দেখে-দেখে বড় হতে থাকা শিশুরা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানো মিলির রুদ্রমূর্তি দেখে প্রথম কিছুই আঁচ করতে পারেনি। এতদিন গলায় দড়ি বেঁধে কুকুর টানাকে তারা বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলারই একটিঅংশ বলে জানতো। কিন্তু মিলি যখন খুব শীতল কিন্তু ভারী গলায় বললো, ‘ কুকুরটাকে ছেড়ে দেও’ তখন জন্ম থেকে এই ধরনের খেলায় অভ্যস্ত শিশুরা যুগপৎ বিস্মিত এবং কৌতুক অনুভব করলো। কোন প্রতিবাদ না করেইঅনেকটা কলা খেয়ে খোসা ফেলে দেয়ার মতো অবহেলায় দড়িটি ছেড়ে দিয়ে শিশুরা আপনমনে হাঁটতে শুরু করলো। খুব ব্যস্ত একটা ফুটপাতে একজন সুন্দরী নারীর রুদ্রমূর্তি দেখে অনেক পথচারিই দাঁড়িয়ে গেল। মিলি আশেপাশের জমায়েতকে অস্বীকার করে খুব দ্রুত কুকুরশাবকের গলার বাঁধন খুলে ফেললো। তারপর পরম মমতায় সেই ময়লা শাবকটিকে নিয়ে রিকশায় চড়ে বসল। কুকুরের প্রতি মিলির মমত্ববোধ আর আন্তরিকতা দেখে খুব কম মানুষই অনুমান করতে পারলো যে, আমরা একটি সিনেমা দেখার জন্য বের হয়েছিলাম। সবাই ধরে নিল, কুকুর শাবকটি কোনক্রমে হারিয়ে যাওয়া একটি পোষা কুকুর। অনেক পরিশ্রম করে মালিক তাকে খুঁজে বের করেছে। কুকুর সাথে নিয়ে সিনেমা হলে ঢোকার রীতি কোন দেশেই নেই। তাই সেদিনতো বটেই আর কোনদিনই আমাদের ‘মনপুরা’ দেখা হয়নি।
যদিও মিলি ঐ চড়–ই কিংবা কুকুরশাবকটিকে ধরে রাখতে পারেনি। দুটি প্রাণীই সুস্থ্য হয়ে সময় এবং সুযোগ বুঝে কোন একদিন নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এইসব পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় মিলি কখনও হতাশ হত না। কোনদিন বেঈমান বা অকৃতজ্ঞ বলে কোন প্রাণীকে সম্বোধন করেনি। চলে যাওয়া কোন প্রাণীর কথা স্মরণ করালে মিলি একটা দীর্ঘ ছেড়ে বলত, ‘ভাল থাকলেই ভালো।’
আমি নিজে কোন প্রাণী না পুষলেও মিলির এই পশু-পাখির প্রতি ভালবাসা খুব উপভোগ করতাম। প্রতিদিন কথা হলে কিংবা দেখা হলে আমি খুব আগ্রহ নিয়ে মিলিদের কলাবাগানের বাসায় আসা নতুন নতুন অতিথিদের গল্প শুনতাম। মিলি আমার মধ্যে পশুপ্রীতির বিস্তার ঘটাতে ‘পেট লাভার বিডি’ নামের একটা সংগঠনের সদস্যও করে দিয়েছিল। আমি মাঝে মাঝে ফেসবুক খুললে দেখতাম রাস্তা থেকে বিভিন্ন অসুস্থ এবং বিপদগ্রস্থ প্রাণীকে ‘রেস্কিউ’ করে পেট লাভার গ্রুপের সদস্যরা পোস্ট দিচ্ছে এবং সেই সব প্রাণীদের ‘এডপ্ট’ নেয়ার জন্য অন্য সদস্যদের অনুরোধ করে যাচ্ছে।
এমনি এক পোস্টে একদিন কেউ একজন তিনটি চোখ না-ফোটা বিড়ালছানার ছবি দিল। কোন এক পরিবার বিদেশ বেড়াতে গেলে নীরব বাড়িতে ঢুকে বিড়ালী ঐ তিনটি শাবকের জন্ম দেয়। পরিবারটি বিদেশ থেকে ফিরে বাসার স্টোর রুমে বিড়াল ছানার অস্তিত্ব টের পেয়ে আর দেরি করেনি। সাথে সাথেই বিড়ালছানাদের রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়। পোস্ট দাতা নিজে একটি বিড়ালের দায়িত্ব নিতে চায় কিন্তু তিনটি বিড়াল পালন তার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং সে এক বা দু’জন সদয় ব্যক্তির সাহায্য কামনা করেছিল। এগিয়ে আসার মানুষ তেমন একটা পাওয়া গেল না। অবশেষে মিলিই এগিয়ে গেল। সে গাড়ি ভাড়া করে কুড়িল যেয়ে তিনটি বিড়ালছানার একটিকে সাথে নিয়ে ঘরে ফিরল। রাতে মেসেঞ্জারে একটা চোখ না ফোটা সাদা-কাল বিড়ালছানার ছবি পাঠিয়ে লিখলো, ‘এডপ্ট করলাম।’


কোন মানুষ মানবিক হলে জগতের প্রত্যেকটি মানুষকে ভালবাসার দায়িত্ব যেমন তার ওপর বর্তায় না তেমনি পশুপাখি ভালবাসি বলেই জগতের সকল পশুপাখিকে ভালবাসার দায়দায়িত্বও আমার ওপর বর্তায় না। দুভার্গ্যজনক হলেও সত্য যে, নানারকম গৃহপালিত পশুপাখির মধ্যে আমি একমাত্র বিড়ালকেই সন্দেহজনক প্রাণীবলে মনে করি। কারন বিড়াল খুবই বুদ্ধিমান এবং ধূর্ত প্রাণী। বিভিন্ন সময় বিড়ালের মধ্যে আমি এমনসব বুদ্ধিমত্তা এবং একই সাথে ধূর্ততার পরিচয় পেয়েছি যে আমি বিড়ালকে কখনই সহজভাবে নিতে পারি না।
একবার একটা বিড়ালকে দেখেছিলাম আমাদেরমুরগীর খাঁচা ভেংগে ভেতরে ঢুকার চেষ্টা করতে। বিড়ালের খাঁচা ভেংগে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা দেখে খাঁচার ভেতরের মুরগীগুলো আতংকে চিৎকার করতে শুরু করে। সেই চিৎকার শুনে আমি খাঁচার পাশে গিয়ে হাজির হলাম। আমার ধারনা ছিল,আমাকে দেখে বিড়াল দৌড়ে পালাবে। কিন্তু বিড়ালটি আমাকে রীতিমত উপেক্ষা করে আমার উপস্থিতিতেই মুরগীর খাঁচায় ঢোকার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল। আমি একটা পা মাটিতে ঠুকে ধর-ধর শব্দ করার পর ছোট্ট বিড়ালটা হঠাৎ আমার দিকে মুখ তুলে, দাঁত-মুখ খেঁচিয়ে, ভয়ংকর একটা শব্দ করে উল্টো আমাকেই ভয় দেখানোর চেষ্টা শুরু করলো। ভয়ংকর মুখভংগী এবং আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়ার জন্য শরীরটাকে টানটান করে রাখা বিড়ালটিকে দেখে ক্ষণিকের জন্য মনে হয়েছিল, আমি কোন বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এমন একটা ভয় কাজ করেছিল যে, আমি একটা কাঠের টুকরো হাতে তুলে নিয়েছিলাম। খালি হাতের আমাকে ভয় না পেলেও এক টুকরো কাঠ হাতে নিতে দেখে বিড়ালটি ঠিকই নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল । কিন্তু নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়েই শান্ত হলো না। আবার আমার দিকে ঘুরে চোখে চোখ রেখে আরও একবার হিংস্র বাঘের অংগভংগী করল। প্রথমবারের আচরনে আমি একটু ভয় পেলেও দ্বিতীয়বারের আচরনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। মানুষ হিসেবে নিজেকে খুব নগন্য মনে হয়েছিল। বিড়ালের মত একটা ক্ষুদ্র প্রাণী যে মানুষকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করতে পারে তা আমার ভাবনারও অতীত ছিল।
বিড়ালের সেই ভয় দেখাতে চাওয়া ভংগিটি আমি হয়তো ভুলে যেতাম। কিন্তু ভুলে যাইনি কারণ প্রথমবার যদি বিড়ালকে ভয় পেয়ে থাকি তবে দ্বিতীয়বার আমি বিড়াল দ্বারা প্রতারিত হয়েছিলাম। মাঝরাতে একটা শিশুর কান্না এবং কয়েকটি কুকুরের ডাক শুনে আমার ঘুম ভেংগে গেল। আমার মনে হয়েছিল, আমাদের বাড়ির ঠিক পেছনেই কোন শিশুকে কেউ ফেলে রেখে গেছে। সেই শিশুটিই কাঁদছে। আমি টর্চ লাইট নিয়ে বের হতেই কয়েকটা কুকুর আমাকে দেখে দৌড়ে পালাল। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি, কোন মানব শিশু নয়, ঝোপের আড়ালে একটা বিড়াল। কুকুর দ্বারা বেষ্টিত হয়ে, বাঁচার জন্য মানুষের সাহায্য পেতে ঐ বিড়ালটিই মানবশিশুর কান্নার মতো শব্দ করে যাচ্ছিল। আমাকে দিয়ে কুকুরদের তাড়ানোর পর বিড়ালের মধ্যে এক ধরনের কৃতজ্ঞতাবোধ আশা করেছিলাম। কিন্তু আমি একটু এগিয়ে তাকে ধরতে যাওয়ার চেষ্টা করতেই বিড়ালটি উল্টো আমাকে আরেকবার ধমক দিয়ে পালিয়ে গেল। আমি ঐ ঘটনায়ও বেশ হতভম্ভহয়ে পড়েছিলাম। তখনও মিলির সাথে পরিচয় হয়নি। পরিচয় হলে আমি মিলির কাছেই বিচার দিতাম। তবে নিজের আগ্রহে ইন্টারনেটে বিড়াল নিয়ে পড়াশোনা করে জানতে পারি, বিড়াল মানুষকে প্রলুব্ধ করতে কয়েকশ ধরনের শব্দে ডাকতে পারে।
ঐ দুটি ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রাণী জগতের এই একটি প্রাণীর প্রতি আমি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম।ব্যক্তিগত জীবনেও আমি ধূর্ত মানুষদের অপছন্দ করি। আর একটা বিড়ালের মত তুচ্ছ প্রাণী যখন বারংবার তার ধূর্ততার পরিচয় দেয় তখন আমি সেই প্রাণীটির প্রতি ভালবাসা ধরে রাখতে পারিনি। আমি প্রায়ই ভাবতাম, যে প্রাণী নিজের প্রয়োজনের তাগিদে মানুষকে ব্যবহার করতে পারে সেই প্রানী কি করে গৃহপালিত হলো? এত বুদ্ধিমান এবং স্বাধীনচেতা একটা প্রাণীর পক্ষে গৃহপালিত হয়ে থাকা বড়ই বেমানান।
পরে ভেবে দেখেছি, যেসব বিড়াল জাতীয় প্রাণী গৃহপালিত হয়নি বা মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়নি তাদের প্রায় সবগুলোই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু গৃহপালিত বিড়াল এবং কুকুরের অস্তিত্ব কখনই সংকটে পড়েনি। তবে কুকুর নানাভাবে মানুষের সমাজে নিজের প্রয়োজনীয়তা প্রমান করেই টিকে আছে। কিন্তু কোন রকম প্রয়োজনীয়তা প্রমান না করেই অত্যন্ত নিভৃতে যে প্রাণীটি নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে তার নাম বিড়াল। আমি বিশ্বাস করি, বিড়াল মানুষকে ভালবেসে নয়, নিজের প্রয়োজনে গৃহপালিত হয়েছে। যে প্রাণী স্বেচ্ছায় গৃহপালিত হয় সেই প্রাণীকে ভালবাসার আমি কোন কারন খুঁজে পেতাম না।
আমার দাদীকেও দেখেছি বিড়াল পুষতে। ঠিক কতটি বিড়াল তিনি পুষতেন তা আর মনে নেই। তবে নির্দিষ্ট সময় খাবার ছিটিয়ে দেয়া ছাড়া তাকে আর তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পরিশ্রম করতে দেখিনি। কিন্তু মিলি যেন ‘এডপ্ট’ শব্দ দিয়ে আমাকে একটা বার্তা দিতে চায়। বিড়ালের গড় আয়ু দশ কিংবা বার বছর। যে সময়টা মিলি আর আমার এক সাথে থাকার কথা সেই সময়ের সিংহভাগ সময়টা বিড়ালটিকেও মিলির সাথে থাকতে দিতে হবে -এই কথাটিই যেন মিলি আমার কাছে পরিষ্কার করে রাখতে চাইছিল।
আমি খুব হতাশ হই। একটা প্রেমের সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়িয়ে নিতে মানুষকে নানারকম প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এই প্রতিবন্ধকতার মধ্যে একটা বিড়ালকে অন্তর্ভূক্ত করতে আমার মন সায় দেয়নি। শুধু একটা বিড়ালকে দত্তক নেয়ার কারনে আমি মিলিকে ত্যাগ করার মতো হাস্যকর একটা অজুহাত দাঁড় করাতে চাইনি। আমি ঠিক করি, মিলিকে অন্তত এই কথাটি জানিয়ে দিব যে, বিড়ালটিকে সে দত্তক নিয়েছে তাতে আমার আপত্তি নেই কিন্তু বিড়ালটিকে আমি আমার বাসায় জায়গা দিতে পারব না।

অন্য পশু-পাখিদের সাথে বিড়ালের একটা পার্থক্য আছে। কুকুরকে বাসার নীচে নিশ্চিন্তে রেখে দেওয়া যায়। পাখি থাকে খাঁচায়। মাছ থাকে এ্যাকুরিয়ামে। এমনকি খোরগোশকেও অল্প বিস্তর খাবার দিয়ে খাঁচায় আটকে রাখা যায়।কিন্তু পোষা বিড়ালকে খাঁচায় আটকে রাখা যায় না। সে মানুষের ঘরেই নিজের জায়গা করে নেয়। মিলির বিড়ালটিও মিলির ঘরেই স্থান করে নিয়েছিল। তাছাড়া মিলির বিড়ালটি এতই ছোট ছিল যে, নিজের ঘরে না রেখে প্রাথমিক অবস্থায় বিড়ালটিকে বড় করাও সম্ভব ছিল না।
বিড়াল ছানাটিকে ঘরে এনে মিলি চরম ব্যস্ত হয়ে পড়লো। বিড়ালের ঘুমানোর জন্য একটা ঝুঁড়ি কিনলো। অনেকগুলো তুলতুলে নরম কাপড় কিনে সেই ঝুঁড়িটি ভরে ফেলল। বিড়াল একটু বড় হলে যেন টয়লেট করতে পারে সেই জন্য একটা পটি কিনলো। দুধ খাওয়ানোর জন্য কিনলো এক জোড়া ফিডার। সাথে এক ডজন নিপল। প্রতিদিন আমার মেসেঞ্জার ভরে ওঠতে লাগল বিড়ালের জন্য কেনা নানারকম সাজ-সরঞ্জাম আর বিড়ালের নানাভংগীর ছবিতে। বিড়ালছানাটি প্রতিদিনই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে মিলির সামনে হাজির হতো। প্রথম এক সপ্তাহ মিলির ছিল বেড়ালের চোখ ওঠা নিয়ে টেনশন। এক সাপ্তাহে পর চোখ ফুটতে না ফুটতেই শুরু হলো বিড়ালছানার জ¦র। জ¦র সারতে না সারতেই শুনলাম বিড়ালছানার এক চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মিলিকে প্রায় প্রতিদিনই পশু চিকিৎসকের কাছে যেতে হতো বিড়ালটিকে নিয়ে। বিড়ালছানাটি একটা সদ্য জন্ম নেয়া মানব শিশুর চেয়েও বেশি ব্যস্ত রাখতে লাগল মিলিকে। ফলে মেসেঞ্জারের সুবাদে যোগাযোগ থাকলেও মিলির সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ কমে এসেছিল।
আমি মিলির সাথে দেখা করতে চাইতাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিলির সাথে যতটা যোগাযোগ হতো- তা আমাকে তৃপ্ত করতে পারত না। আগে যতই ব্যস্ততা থাকুক আমরা সময় করে সপ্তাহে একবার এক সাথে কিছু সময় কাটাতাম। দূরে কোথাও লংড্রাইভে যেতাম কিংবা কমপক্ষে কোন কফিশপে হাতে হাত রেখে কফির গ্লাসে চুমুক দিতাম কিন্তু বিড়ালকে এডপ্ট করার পর মিলি সময় বের করতে পারছিল না। আমি অনুযোগ করলে মিলি বলতো, ‘বাসায় আসো না কেন? আমার বিড়ালটিকে একবার দেখে যাও।’
আমি একবার মিলির বিরহে কাতর হয়ে সত্য সত্যই মিলিকে দেখতে তাদের বাসায় গেলাম। আমাকে দেখে মিলির মুখে যেন আলো ফুটে ওঠল। আমি আশ^স্থ হয়েছিলাম এই ভেবে যে, বিড়াল মিলিকে ব্যস্ত রাখতে পেরেছে কিন্তু আমাদের প্রেমে দেয়াল তুলতে পারেনি। কিন্তু আমার সেই ভাবনা স্থায়িত্ব পায়নি। আমি কেমন আছি, শরীরটা কেমন, এতদিন মিলিকে মিস করেছি কি-না- তেমন কোন প্রশ্নে না যেয়ে মিলি ঘুমন্ত বিড়ালটিকে এবটা ঝুঁড়ির ভেতর থেকে তুলে নিয়ে আসে। আমি অনুভব করি, মিলিকে বিড়ালটি ততদিনে এতটাই আচ্ছন্ন করে ফেলেছে যে, মিলি ধরেই নিয়েছে আমি বিড়াল দেখতে এসেছি। মিলিকে নয়। অথবা মিলির মনে হয়েছিল মিলি আর বিড়ালছানাকে পৃথক করে দেখার কিছু নেই। ওটাকে মিলির একটা অংগ বলেই সবাই বিবেচনা করতে শুরু করেছে।
কিন্তু মিলি যতই বিড়ালকে উঁচু করে ধরুক, আমি মিলিকেই দেখি এবং মিলিকে দেখে খুব হতাশ হই।ওর চোখে-মুখে ছিল রাজ্যের ক্লান্তির ছাপ। ভিডিও কলে মিলিকে যতটা ক্লান্ত এবং পরিশ্রান্ত মনে হয়েছিল বাস্তবের মিলিকে তার চেয়ে ঢেড় বেশি বলে মনে হলো। আমার চাহনী দেখে মিলি স্নান শেষে হেসে বলে, ‘ পিংকু রাতে ঘুমায় না। আমাকেও জাগিয়ে রাখে। আর ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি করে আমিও ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’
কথা শেষ করেই মিলি তার কোল থেকে বিড়ালছানাটি আমার কোলে দিতে চায় কিন্তু বিড়ালছানা আমার চোখের দিকে চেয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিল। কোথায় যেন পড়েছিলাম, বিড়াল মানুষের চেহারা দেখলেই বুঝে কে তাকে ভালবাসে কে ভালবাসে না। আমি যে বিড়াল পছন্দ করি না তা ঐ বিড়ালছানা আমাকে এক পলক দেখেই বুঝে নিয়েছিল। তারপরও মিলি অনেকটা জোর করে বিড়ালটিকে আমার কোলে দিতে চাইলে বিড়ালটি আমার হাতে কামড় দিয়ে লাফিয়ে নেমে যায়। আমার কোল থেকে লাফিয়ে নেমেই বিড়ালটি থামল না। নির্দিষ্ট একটা দূরত্বে যেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বাঘের মতো গর্জন করতে চেষ্টা করতে লাগল। মিলি পুরো ঘটনায় বেশ বিব্রত হল। কোলে দিতে না পেরে হতাশ হয়ে বিড়ালটিকে সে বারবার দূরে সরিয়ে দিতে চাইছিল। বিড়ালটি মিলির ধমকে একটু দূরে সরে যাচ্ছিল বটে কিন্তু কিছুক্ষণ পরই কোন এক অজানা আক্রোশে তাড়িত হয়ে আবার ফিরে আসছিল এবং নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আমার দিকে মুখ তুলে ভয়ংকর শব্দ করে যাচ্ছিল। বিড়ালের ঐ ভয়ংকর শব্দ শুনে বিচলিত হয়ে মিলিদের বাসার অনেক সদস্যই নিজের ঘর থেকে বের হয়ে আসতে থাকে।
মিলিদের বাসায় আমার দীর্ঘদিন ধরেই আসা-যাওয়া। ওদের পরিবারের সাথে আমার সম্পর্কটাও খুব সহজ। মিলির সাথে বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন উৎসব-পার্বনে এই পরিবারে আমার উপস্থিতি নিয়মিত একটি ঘটনা। তারপরও তারা বেশ বিস্ময় নিয়ে বিড়ালটির ঐ আচরন দেখে কপালে ভাঁজ তুলে আবার নিজের ঘরে ফিরে যাচ্ছিল। মিলিদের বাসার নতুন বুয়া বিড়ালের আচরণ দেখে যেতে যেতে আমাকে শুনিয়ে দেয়, ‘ বিলাইতো আগে কোনদিন এমুন করে নাই।’ আমার মনে হচ্ছিল, আমি একজন খুনি আর মিলির বিড়ালটি আসামী ধরার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর। এতদিন সে আমাকে খুঁজে পায়নি। আজ যেন খুঁজে পেয়েছে।
আমি স্পষ্টই অনুভব করি, বিড়ালটি মিলিদের বাসায় আমার উপস্থিতি মেনে নিতে পারছে না। একটা ‘এডপ্ট’ করা বিড়ালকে ঐ আচরনের জন্য ঘর থেকে বের করে দেয়া যায় না। এসব ক্ষেত্রে সম্মান বাঁচাতে আমাদেরই সরে আসতে হয়। ফলে একটা জরুরী কাজের অজুহাত দেখিয়ে আমিই মিলিদের বাসা থেকে বের হয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিই। মিলির প্রবল বাঁধার মুখেও ‘আজ আসি’ বলে বিড়ালের চিৎকার পেছনে ফেলে অনাহুত অতিথির মতো আমি বের হয়ে আসি। পেছনে শুনি মিলি বিড়ালকে ধমক দিয়ে যাচ্ছে, ‘ পিংকু, এমন করলে আমি কিন্তু তোমাকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলব।’
মিলিদের বাসা থেকে বের হবার সময় দেখি, দরজার পাশে রাখা মিলির প্রিয় এ্যাকুরিয়ামের ওপর ধূলো পড়েছে। পানি আগের মতো স্বচ্ছ নেই। বাসার বারান্দায় থাকা পাখির খাঁচাটি খালি। সম্ভবত পাখিটি ওড়ে গেছে। বাসার সামনে যে বিদেশি কুকুরটা বাধা থাকত সেটিকে বেশ রুগ্ন মনে হয়। কুকুরটি আপন মনে ঘুমাচ্ছে। আমি কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে অনুভব করতে পারি, মিলির পশু-পাখির প্রতি যে প্রেম তার পুরোটাই বিড়ালছানাটি কেড়ে নিয়েছে। নিজের ঘরের অন্য প্রানীদের জন্য তার আর তেমন একটা ভালবাসাঅবশিষ্ট নেই।
এমনিতেই বিড়ালকে আমি সন্দেহের চোখে দেখতাম, তার ওপর মিলিদের বড়িতে যেয়ে ঐ অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হবার পর থেকে আমি মিলির বিড়ালটিকে নিয়ে অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে শুরু করলাম। মিলিও বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেনি। সে আমাকে নানাভাবে আশ্বস্থ করতে চাইতো। কোন যুক্তিতে মিলি যখন পারত না তখন বলতো, ‘ কি করবা বল, আল্লাহ তাদের এই ভাবে বানাইছে। আমরাতো আশরাফুল মখলুকাত। ধৈর্য্য আমাদেরই ধরতে হবে।’
মিলির একটা বিশ্বাস ছিল, অন্য প্রাণীদের আমি যেমন ভালবাসি বিড়ালকেও তেমনি ভালবাসবো এবং বিড়ালটিও সময়ের সাথে সাথে আমাকে ভালবাসতে শুরু করবে। কিন্তু বিড়ালের বিষয়ে আমার যে আরো কিছু মন্দ অভিজ্ঞতা আছে তা আমি মিলিকে সরাসরি বলতে পারি না। তার বদলে আমি যতটা দরকার তার চেয়ে একটু বেশিই নিষ্পৃহতা দেখাতে শুরু করেছিলাম।
মিলি বিড়ালকে ত্যাগ না-করে আমার আর বিড়ালের মধ্যে এক ধরনের সখ্যতা তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকল। যেদিন মিলিদের বাড়ি থেকে ফিরে এলাম সেদিন মিলি বিড়ালছানার দু:খী-দু:খী চেহারার একটা ছবি পাঠাল। তার নীচে লিখা, ‘ আই এম সরি, পাপা।’
মিলির ধারনা ছিল ‘পাপা’ ডাক শুনে আমি বিড়ালটিকে ক্ষমা করে দিব। কিন্তু মিলির পাঠানো ছবি আমাকে আনন্দ না দিয়ে বিড়ালটির প্রতি আরো বিদ্বেষ তৈরি করতে শুরু করল। মিলি ভালবাসার অধিকারকে ধীরে ধীরে নির্যাতনের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। সে কখনো মেসেঞ্জারে, কখনো ভাইবারে ছবি পাঠাতে থাকল। রাতে আচমকা ভিডিও কল দিয়ে বলতো, ‘দেখতো, আমার পিংকু সোনা কেমন সুন্দর করে দুধু খায়।’
আমি চেয়ে দেখতাম, মানুষ যেভাবে নিজের শিশুকে আগলে ধরে দুধ খাওয়ায় ঠিক সেভাবে মিলি একটা ফিডার ধরে রেখেছে বিড়ালছানার মুখে আর বিড়ালছানা সেই ফিডারের নিপল কামড়ে কামড়ে দুধ খাচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে দৃশ্যটি বেশ সুন্দর লাগার কথা। কিন্তু আমার কাছে ভাল লাগত না। মানুষের বাচ্চার মতো ফিডার টানা বিড়ালশাবকটিকে দেখে আমার কেন যেন একটা অস্বস্থি হতো।এই অস্বস্থি এমন একটা জায়গায় চলে গেল যে, আমি একদিন বলতে বাধ্য হলাম, ‘ মিলি, তুমি বিড়াল নিয়ে বাড়াবাড়ি করতেস।’
মিলি বেশ অবাক হয়েই বললো, ‘ তুমি কোথায় বাড়াবাড়ি দেখলে। সবায় এভাবেই বিড়াল পালে।’
আমি মিলিকে বুঝাতে চাই, মিলি বিড়ালের প্রতি দায়িত্ব বলে যা করছে তা আর দায়িত্বপালনের পর্যায়ে নেই। এটাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘অবসেশান।’
কিন্তু ‘অবসেশান’ শব্দটি শুনে মিলি বেশ একটু শব্দ করে হেসে ওঠে। তারপর খুব ঠাণ্ডা গলায় বলে, ‘ আজীম, আমি কিন্তু পিংকুকে এডপ্ট নিয়েছি। খারাপ হলেও কি ফেলে দিতে পরব?’
‘এডপ্ট’ শব্দটা শুনে আমার রাগ বেড়ে যায়। আমার সাথে ততদিনে মিলির বিয়ের তারিখ পাকা হয়ে গেছে। জীবন নিয়ে আমার আর মিলির যে পরিকল্পনা তাতে বিড়ালটি কখনই ছিল না। এখন ‘এডপ্ট’ শব্দটি ব্যবহার করে মিলি যেন তার স্বেচ্ছায় নেয়া দায় আমার ওপরও চাপিয়ে দিতে চায়। আমি মিলিকে ভালবাসি তার মানে এই না যে, মিলি যা কিছু ভালবাসে তা আমাকেও ভালবাসতে হবে। নানারকম সংকোচের কারনে যে কথাটি বলতে পারছিলাম না সেই কথাটি আমি অবশেষে বলতে বাধ্য হয়েছিলাম। বেশ শক্ত করেএবং একটু ঘুরিয়ে কঠিন করে বলেছিলাম, ‘ মিলি, তুমি বিড়ালকে ভালবাস তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমি বিড়ালসহ তোমাকে আমার বাসায় স্বাগত জানাতে পারবো না।’
আমার কথায় মিলি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এমন একটা কথার জন্য মিলি যেন প্রস্তুত ছিল না। সে ধরেই নিয়েছিল, বিয়ের পর বিড়ালসহ আমার বাসায় চলে আসবে। মিলি যেমন বিড়ালের মা হয়েছে আমিও তেমনি বিড়ালের বাবা হবো। তারপর আমরা তিনজনে সুখে-শান্তিতে বসবাস শুরু করবো। কিন্তু আমার কথায় মিলি স্তব্ধ হয়ে যায়। তার গাল বেয়ে জল নামতে থাকে। প্রথমবার গোল্ডফিসের জন্য যে জল দেখে আমার ভেতরটা কেঁপে ওঠেছিল এবার সেই একই জল আমার ভেতরে কোন কম্পনই তৈরি করতে পারে না। আমি বিরক্ত হয়ে লাইন কেটে দিই।

মিলি আমার কথা রেখেছিল। সে বিয়ের পর তার বিড়াল ছাড়াই আমার ঘরে এসেছিল। অনেকদিন পর মিলিকে আমি পুরোপুরি পেতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু মিলির যেন কোথায় একটা বাঁধা ছিল। সে আর দশজনের মতই সুপার শপে যাচ্ছিল। নিজে পছন্দ করে বাজার করছিল। ঘর সাজাচ্ছিল কিন্তু কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে যেত। আমি হানিমুনে দেশের বাইরে যেতে চাইলে মিলি নানারকম অজুহাত দেখাতে থাকল। শেষ পর্যন্ত গেল ঠিকই কিন্তু দূরবর্তী কোন দেশে না গিয়ে শতবার যাওয়া কক্সবাজারেই গেল।
কক্সবাজারে আমরা যে হোটেলে ওঠেছিলাম সেই হোটেলে ব্রেকফার্স্ট ছিল কম্পলিমেন্টারি। এক সকালে নাস্তা খেতে গিয়ে দেখি, একটা বিড়াল মিলির পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছে। সম্ভবত সে এভাবেই খাবার সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু আমি বিস্মিত হয়ে দেখি, মিলি বিড়ালরটির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। পিংকু যে মিলির সবটা ভালবাসা কেড়ে নিয়ে মিলিকে রিক্ত করে দিয়েছে তা মিলিরও অজানা। সে ঐ বিড়ালটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেনিজের ব্রেডে জেলি মাখাচ্ছিল। নানাভাবে দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করে বিড়ালটি যখন ব্যর্থ তখন আমি এক টুকরো রুটি নীচে ফেলে দিই। বিড়ালটি সেই টুকরো মুখে নিয়ে দৌড়ে পালায়। আমি ভেবেছিলাম, মিলি কিছুই দেখেনি। কিন্তু বিড়ালকে এক টুকরো রুটি দেয়ার সাথে সাথেই মিলি মুখ তুলে আমার দিকে তাকায়। আস্তে আস্তে বলে, ‘ভন্ডামী না করলে হয় না, আজীম?’
আমি মিলির আচরনে বিস্মিত হই। প্রানীক’লের প্রতি মানুষের এট্রাকশান থাকে, কারো থাকে ডিভোশন। কিন্তু মিলির নিজের বিড়ালের প্রতি যা তৈরি হয়েছে তা ‘অবসেশান’ ছাড়া আর কিছু নয়। আমার মনে হতে থাকে, মিলির সংসারে থেকেও না থাকার যে ফাঁকটা সেই ফাঁকের ভেতর ওর বিড়ালটা বাস করে। আমার মনে হয়েছিল, মিলি যে ব্যাংকক, পাতায়া কিংবা বালি না যেয়ে কক্সবাজার এসেছে তার পেছনেও কারন ঐ বিড়াল। কারন মিলি মনে করে বিড়ালটি তার অবর্তমানে অনিরাপদ থাকে। সুতরাং সে ভৌগলিক ভাবে বিড়ালের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চায়নি। আমাকে ম্যানেজ করার পাশাপাশি বিপদে-আপদে যেন অল্প সময়ের মধ্যে বিড়ালের পাশে যেয়ে দাঁড়াতে পারে সেই ভাবনায় মিলি হানিমুন করার জন্য কক্সবাজারকে পছন্দ করেছে। হোটেলের ডাইনিং রুমে মিলির আচরণ দেখে মনে হলো, মিলি আমার অবর্তমানে প্রায়ই তাদেরবাসায় যায় , বিড়ালের যতœ-আত্তি শেষ করে এবং আমি বাসায় ফিরে আসার আগেই আবার ফিরে আসে। যদিও আমার সামনে বিড়াল নিয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করে না কিন্তু আমার লজিক বলে, বিড়ালকে ছেড়ে মিলির এতদিন আমার সাথে থাকার কথা নয়।
আমার ধারনার সত্যতার প্রমাণ পেতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয় না। আমি কয়েকদিনের জন্য অফিসের কাজে বিদেশ গেলে মিলি বেশ আনন্দিত হয়। আমার অনুপস্থিতির চেয়ে বিড়ালের কাছে থাকার আনন্দটাই মিলিকে বেশি আকর্ষণ করেছিল। আমিও না-বুঝার ভান করে মিলিকে তাদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। এবং সে যাত্রায় প্রায় বিশদিনের প্রশিক্ষণ শেষ করেদেশে ফিরে এসে দেখি, মিলির বিড়াল আমার বাসায়। বিড়ালের এক পায়ে ব্যান্ডেজ বাধা। মিলির কোলে থাকা ব্যান্ডেজ বাঁধা বিড়ালটি অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি বিড়ালটিকে উপেক্ষা করে আমার নিজের রুমে ঢুকে পোষাক পাল্টাতে শুরু করি। আমি ঘরে ঢুকে পোষাক খুলতেই মিলি বলতে শুরু করে, ‘ ঐ বাসায় পিংকুর একেবারেই যত্ন হয় না। পিংকু বাসার বাইরে গেসিল খেলতে। অন্য একটা বিড়াল এসে এমন মার মেরেছে যে পিংকুর পা কেটে গেছে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে সেলাই করাতে হয়েছে। ডাক্তার বলেছে কাটা জায়গাটা শুকানো পর্যন্ত ওকে সাবধানে রাখতে। তাই আমি যতœ করার জন্য ক’দিনের জন্য ওকে এনেছি।’
পিংকুকে বাসায় আনার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে মিলি বারবারই বিড়ালের ব্যান্ডেজ বাঁধা পা’টি আমার সামনে তুলে ধরছিল। আমি একপলক তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। মিলি ভেবেছিল, ঐ কাটা পা দেখে আমি হয়তো একটু সমব্যথি হবো। কিছুটা হয়তো সমবেদনা আমার মনে আসেও কিন্তু আমি তা প্রকাশ করি না। আমি কোন কথার জবাব না দিয়ে আমার নিজের জিনিসপত্র গোছগাছ করতে থাকি। পোষাক পাল্টানো শেষ করে যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে মিলিকে ডেকে এনে ব্যাগ খুলে ওর জন্য আনা নানারকম উপহার সামগ্রী দেখাতে থাকি। কিন্তু মিলি আমার আনা উপহার সামগ্রীর প্রতি কোন আগ্রহই দেখায় না। সে আবার বলতে শুরু করে, ‘ যদি সুস্থ্য হওয়া পর্যন্ত পিংকু আমাদের বাসায় থাকে তবে তুমি কি আপত্তি করবে?’
পিংকুকে নিয়ে মিলির উদ্বেগটা আমার কাছে অযৌক্তিক মনে হয় না। বিড়ালের পায়ের ব্যন্ডেজ দেখেই আমি বুঝেছি জখমটা বেশ মারাত্মক। আমি বিড়ালকে যতই অপছন্দ করি, নিষ্ঠুর হতে পারি না। কিন্তু এও অনুভব করি, মিলির বিড়ালের প্রতি ভালবাসা বা সংশ্লিষ্টতা এখন আর স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই। তাই সতর্কতার সাথে বলি, ‘ রাখ। সুস্থ্য হওয়া পর্যন্ত রাখতে চাইলে আমার আপত্তি নেই।’
আমার অনুমোদনে মিলি এত খুশি হয় যে, বিড়ালটিকে কোল থেকে নামিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমার সাথে সংসার শুরু করার পর এত খুশি মিলিকে আমি আর কোনদিন দেখিনি। কিন্তু মিলির শরীরে আমি কেমন একটা গন্ধও পাই। সম্ভবত বিড়ালের শরীরের গন্ধ। সাধারনত বিড়ালরা তার নিজের অধিক্ষেত্র বোঝাতে মূত্র ত্যাগ করে রাখে। আর অন্য বিড়ালের কাছে নিজেদের মালিকানার কথা জানান দিতে নিজের পছন্দের জিনিসের সাথে শরীর ঘষে গন্ধ মাখিয়ে রাখে। মিলি যে এখন বিড়ালের নিয়ন্ত্রণে তা আমাকে জানানোর জন্য ওর শরীরেও গন্ধ মেখে রেখেছে বিড়ালটা। গন্ধ না পেলেও আমি জানতাম, মিলির বিড়াল অনেকদিন আগেই মিলির নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিয়েছে। এখন আমি যে মিলিকে পাই তা বিড়ালের মিলি। আমি বিড়াল না তথাপি মিলির শরীরে যে গন্ধটা পাই তা আমার ভাল লাগে না। আমি মিলির আলিঙ্গনকে দীর্ঘায়িত না করে গোসল করতে ছুটি। মিলি বুঝে কিনা জানি না। তবে গোসলে যেতে যেতে আমি অনুভব করি, মিলি পেছন থেকে দ্রুত আলিংগন থেকে আমার মুক্তির কারন অনুমান করতে চেষ্টা করছে।
ওয়াশরুমে যেতে যেতে দেখি ডাইনিং টেবিলের কাছে দুটি বাটি রাখা। একটাতে আধ-খাওয়া একটা মাছ। অন্যটাতে দুধ লেগে আছে। টয়লেটে গিয়ে দেখি একটা ছোট পটি। তাতে ছড়িয়ে রাখা বালুর ওপর ছোট ছোট কালো মল। আমি বুঝি, আমার অবর্তমানে আমারই বাসায় বিড়ালটা বেশ জাকিয়ে বসেছে। রাতে মিলি অন্য একটা ঘরে একটা বিশেষ ধরনের ঝুঁড়ির ভেতর যতœ করে বিড়ালটিকে শুইয়ে দিয়ে আসে। আমি কিছু না বললেও মিলি একটা গোসল দিয়ে বিছানায় এসে আমার পাশে শোয়। অনেকদিন দূরদেশে থাকার পর আমিও মিলিকে সেদিন চাচ্ছিলাম। কয়েকবার চুম্বনের পর আমরা যখন শরীরকে উন্মুক্ত করলাম তখনই আমি হঠাৎ দেখি অন্ধকারে এক জোড়া চোখ জ¦লজ¦ল করছে। আমি কিছু বলার আগেই মিলি এক হাতে আমার মাথা জাপটে ধরে বলতে থাকে, ‘ পিংকু, যাও যাও।’
কিন্তু পিংকু না যেয়ে লাফ দিয়ে বিছনায় ওঠে আসে। বিড়ালকে আমাদের বিছানায় উঠতে দেখে আমি চ’ড়ান্ত রকমের হতাশ হয়ে পড়ি। আমার শরীর মুহূর্তে শীতল হয়ে যায়। মিলি এক হাতে আমাকে ধরে রেখেছিল।কারন তার ধারনা ছিল, বিড়ালটি বকুনি খেয়ে চলে যাবে এবং দ্রæতই আমরা আবার শারিরীকভাবে মিলিত হতে পারব। কিন্তু আমি একটু জোর খাটিয়েই মিলির আলিঙ্গন থেকে মুক্তি নিই। কারণ আমি বুঝে গেছি আজ আর আমাদের মধ্যে শারীরিক মিলন হবে না।
পিংকু ততক্ষণে তার চিরদিনের অভ্যেস মত মিলির বুকের ওপর শুয়ে পড়তে চেষ্টা করছে। মিলিও যেন একটু ক্ষেপে ওঠে। সে হঠাৎ করেই বিড়ালটিকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে তার উন্মুক্ত বুকের ওপর থেকে সরিয়ে দেয়। মিলির ধাক্কায় বিড়ালটি বেশ দূরে ছিটক পড়ে এবং একটা আর্তনাদ করে ওঠে। সেই আর্তনাদ শুনে মিলি আবার ভয় পেয়ে যায়। তার মধ্য থেকে কাম দূরীভ’ত হয়ে কাল্পনিক মাতৃসত্তাটা জেগে ওঠে। সে ঘরের বাতি জ্বালিয়ে বিড়ালের আর্তনাদের কারন দেখতে চায়। ততক্ষণে বিড়ালটির কাটা জায়গা থেকে আবার রক্ত পড়া শুরু হয়েছে। মিলি সেই রক্তে ভিজে ওঠা ব্যান্ডেজ দেখে আবার চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। আমি যেন সাহায্য করি সেই জন্য কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, ‘দেখ দেখ, পিংকুর কাটা জায়গা থেকে রক্ত বের হচ্ছে। পুরোটা ব্যান্ডেজ রক্তে ভিজে যাচ্ছে।’
মিলির কান্নায় আমার মন গলে না। আমি ঘুমিয়ে পড়েছি এমন একটা ভান করে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকি। মিলি কাঁদতে কাঁদতেই বাতি বন্ধ করে আমাদের রুম থেকে বের হয়ে যায়। আমি শুনি মিলির বিড়ালের সাথে কথোপকোথন। ‘ ব্যথা পেয়েছ, বাবা? মা ব্যথা দিয়েছি ?সরি বাবা, সরি। আর কখনো এমন করবো না। মাকে মাফ করে দেও, প্লিজ।’
আমি ঘুমিয়ে যেতে যেতে ভাবি, মিলির কোলে থাকা বিড়ালটি কোন অর্থেই মানুষ নয়। যতই মিলি মানসিকভাবে এই বিড়ালের সাথে সংশ্লিষ্ট হোক না কেন শেষ পর্যন্ত এটি একটি শ^াপদই। কিন্তু মিলি এই শ্বাপদের প্রতি এতটাই অনুরক্ত যে, সে বিড়ালটিকে একটা মানুষ বলেই বিবেচনা করছে। যুক্তি দিয়ে মিলিকে আটকানো সম্ভব নয়। আঘাত করে যদি চেতনা ফিরিয়ে আনা যায় তবে সেই একমাত্র পথ।

পরদিন ঘুম থেকে ওঠে দেখি, আমার ঘুম ভাংগার আগেই মিলি বিড়ালটিকে নিয়ে বের হয়ে গেছে। নাস্তার টেবিলে দেখি ছোট্ট একটা চিরকুট। তাতে লিখা, পিংকুর সেলাই ছিড়ে গেসে। আমি তাকে নিয়ে ভেটারনারি সার্জনের কাছে যাচ্ছি। তুমি খেয়ে নিও। আমি চিকিৎসা শেষ করে ফিরে আসব।’
রাতে যে মিলির কান্না বা উৎকন্ঠায় আমি ইচ্ছে করেই সংগী হইনি তাতে মিলি বুঝে গেছে, বিড়ালটির কোন বিষয়ে আমি মিলির সাথে জড়াব না। আমিও চেয়েছিলাম, বিড়াল আর মিলি যে আমার কাছে সম্পূর্ণ পৃথক দুই সত্তা তা যেন মিলি জানে।সেই জানিয়ে দেয়ার কারনেই মিলি আমার কাছ থেকে কোন সাহায্য কামনা না করে নিজেই বিড়াল নিয়ে ডাক্তারের কাছে চলে গেছে। আমি চাই, মিলি লড়াইটা একাই করুক। লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়–ক। যদি মিলির আর্থিক অবস্থা ভাল না হতো তবে আমি বিড়ালের চিকিৎসায় কোন টাকাও ব্যয় করতে দিতাম না। কিন্তু মিলি পারিবারিক ভাবেই স্বচ্ছল। সে আমার কাছ থেকে শুধু সমবেদনাই প্রত্যাশা করে।
আমি নাস্তা শেষ করে অফিসে চলে যাই। সারাদিন মিলি বা বিড়ালের কোন খোঁজ নেই না। সন্ধ্যায় আমার এক বন্ধুর বাসায় দাওয়াত ছিল। বাসায় ফিরে মিলিকে স্মরণ করিয়ে দিতেই সে আঁতকে ওঠে। খুব বিস্মিত হয়ে বলে, ‘ পিংকুর এই অবস্থায় আমি সেজেগুজে বেড়াতে যাব? তুমি একবারও সারাদিনে ফোন করে ওর খোঁজ নেওনি। ওর একশ চার ডিগ্রি জ¦র।’ তারপর ছোট্ট একটা বিরতি দিয়ে বলে, ‘ আজীম, যে মানুষটিকে আমি ভালবেসেছিলাম তুমি সেই মানুষটি নও। হয় তুমি বদলে গেছ অথবা তুমি কোনদিনই প্রানীদের ভালবাসতে না। তোমার পুরোটাই ছিল অভিনয়।’
মিলির কোন কথায় আমি জবাব দিই না। কারণ প্রাণীর প্রতি ডিভোশন কিংবা এট্রাকশন মেনে নেয়া যায় কিন্তু অবসেশান মেনে নেয় কঠিন। এর আগে মিলি যেসব প্রাণীকে ভালবেসেছে তার সবগুলোর প্রতিই আকর্ষনবোধ কিংবা ডিভোশন কাজ করেছে। কিন্তু বিড়ালের প্রতি মিলি যা দেখাচ্ছে তা অনেক আগেই অবসেশানের পর্যায়ে চলে গেছে। মিলি আমাকে ঐ অবসেশানের জায়গা থেকেই দেখছে।মিলি যখন আমাকে দোষারোপ করছে তখন আমার সামনের ঝুঁড়িতেই সেই বিড়ালটি শোয়া। আমি ইচ্ছে করলেই ঝুঁড়িতে শুয়ে থাকা বিড়ালটির শরীরে হাত বুলিয়ে জ¦রটা দেখতে পারতাম। তাতে মিলি একটু সান্তনা খুঁজে পেত। কিন্তু আমি যতটুকু মানবিক আচরন করা দরকার ততটাও করি না। কারণ আমার একটু মানবিক আচরনকে মিলি প্রশ্রয় বলে ভেবে বসতে পারে। মিলির বিড়ালের প্রতি অতি সম্পৃক্ততার বিষয়টিকে অন্তত আমি বিন্দু পরিমাণ প্রশ্রয় দিতে রাজি না। এবং সেটা মিলিরই ভালর জন্য।
রাতে বিড়াল ঘুমালে মিলি যখন আমার রুমে শুতে আসে আমি তখন মন থেকেই মিলিকে বলি, ‘ বিড়াল সবচেয়ে ইনসিকিউরড ফিল করে যখন সে ঘুমায়। তাই সে মানুষকে ভাল না বেসেও নিজের নিরাপত্তার খাতিরেই মানুষের সাথে এক বিছানায় ঘুমাতে চায়। দীর্ঘদিন তোমার সাথে একই বিছানায় ঘুমিয়ে তার অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন আচমকা তুমি যে তাকে সরিয়ে দিচ্ছ তাতে বিড়ালটি অনিরাপদ বোধ করবে। সে রাতে আবার তোমাকে খুঁজতে হাজির হবে। তুমি অন্তত বিড়ালটা সুস্থ্য হওয়া পর্যন্ত অন্য ঘরে বিড়ালকে সাথে নিয়ে শুতে পার। এতে আমার আপত্তি নেই।’
মিলি আমার কথায় একটু অবাক হয়। এটা কি বিড়ালের প্রতি আমার ভালবাসা নাকি মিলির সাথে আমার দূরত্বের লক্ষণ তা বুঝার চেষ্টা করে কিছুক্ষণ। ততদিনে আমি যেমন বিড়ালকে সন্দেহের চোখে দেখি তেমনি মিলিও আমাকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছে। সুতরাং মিলি বিছানা ত্যাগ না করে ঘরের দরজা লাগিয়ে দেয়। কিন্তু মাঝরাতে আমি বন্ধ দরজায় কোন এক ছোট্ট শ্বাপদের আঁচড়েরর শব্দ পাই, সাথে কান্না। আমি সেই কান্নার শব্দে বিব্রতবোধ করি। ঘরের বাতি জ্বালিয়ে মিলিকে ডাকি। মিলি এবার নিজেও বেশ বিব্রত হয়। আমি কিছু বলার আগেই নিজের বালিশটা নিয়ে আস্তে আস্তে অন্য ঘরে চলে যেতে থাকে। দরজার কাছে যেয়ে হঠাৎ একটু দাঁড়িয়ে যায়। আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, ‘ বাতিটা বন্ধ করে দিব?’
মিলির যে আমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না তা আমি বেশ বুঝি। কিন্তু পরিস্থিতি যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে মিলির আমার বিছানা ত্যাগ না করে উপায় নেই। আমি মিলির চোখের দিকে তাকাতে পারি না। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে কী বলবো ভাবছিলাম এমন সময় আরো করুণ স্বরে বিড়ালটি কেদে ওঠলে মিলি বাতি না নিভিয়েই দরজাটি খুলে বের হয়ে যায়।
মিলির সেই চলে যাওয়া বহুদিন আমার মনের ভেতর গেঁথে ছিল। কারন মিলি আমার ঘরে আর কখনো শুতে আসেনি। বেশ কয়েক মাস বিড়ালটিকে নিয়ে জমের সাথে টানাটানির পর মিলি যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসল তখন আমার মিলি আর আমার মিলি নেই। সে ততদিনে অন্য কোন মিলি হয়ে গেছে।
একদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে কোথাও কোন সাড়া শব্দ পাই না। নাস্তার টেবিলে গিয়ে একটা চিঠি পাই। মিলি লিখেছে, সে আর আমার সাথে থাকতে চায় না। তাই পিংকুকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। যেদিন আমি পিংকুকে ভালবাসতে পারব সেদিন সে ফিরে আসবে।
আমি মিলির চিঠি পেয়ে একটু বিস্মিত হই। আমি কোন শর্ত দিয়ে মিলিকে ভালবাসিনি। মিলিও এমন কোন শর্ত দিয়ে আমাকে গ্রহন করেনি। তাহলে আজ কেন এমন শর্ত ঝুলিয়ে দিচ্ছে তা আমার বোধগম্য হয় না। আমাদের মধ্যে কথা ছিল, বিড়ালটা সুস্থ্য হলে মিলি বিড়ালটিকে তাদের বাড়িতে রেখে আসবে। কিন্তু সুস্থ্য হবার পর বিড়ালটিকে নিয়ে মিলির প্রস্থান আমাকে বেশ অবাক করে দেয়। আমি মিলির পশুপাখির প্রতি প্রেমকে ছোট করে দেখিনি। এমনকি বিড়ালের সাথে মিলিকে সম্পর্কচ্ছেদ করতেও বলিনি। আমি চেয়েছিলাম বিড়ালের সংস্পর্শ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে। আমার এই ছোট্ট চাওয়ার জন্য মিলি আমাকে ত্যাগ করতে পারে তা আমি কোন দিন কল্পনায়ও আনিনি।
মিলির বাড়াবাড়ি আমি যতটা সহ্য করেছি তা মিলিকে ভালবাসতাম বলেই। কিন্তু এতটা ছাড় দেয়ার পরও মিলির এই ছেড়ে যাওয়া আমাকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমি প্রকৃত অর্থে মিলির কাছে কতটা মূল্যহীন হয়ে পড়েছিলাম। এই মূল্যহীনতা আমাকে এতটাই কষ্ট দেয় যে, আমি মিলিকে ফোন করি না। মিলিকে দেখতে তার বাবার বাড়ি যাওয়াও বন্ধ করে দিই।
মাস দুয়েক সময় পার হবার পর মিলির কাছ থেকে একদিন ডিভোর্সলেটার পাই। আমার ভেতরে যা ছিল তার পুরোটাই অভিমান। মিলির প্রতি আমার ভালবাসায় কোন কমতি ছিল না। আমি ভাবতাম, মিলি একদিন তার ভুল বুঝতে পারবে এবং আমাকে চমকে দিয়ে বাসায় ফেরত আসবে। কিংবা ছোট একটা মেসেজ পাঠিয়ে জানতে চাইবে, আমি কেমন আছি। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছু ঘটল না। আমি পেলাম একটি ডিভোর্সলেটার।
ডিভোর্সলেটারটি আমাকে পুরোপুরিই বিমর্ষ করে দেয়। আমি জানতাম বিড়াল মানুষকে প্রলুব্ধ করতে পারে। কিন্তু একটা সম্পর্ককেএমন একটা পরিনতির দিকে টেনে নিতে পারে তা কখনও ভাবিনি। আমিও ডিভোর্সলেটার পাওয়ার পর সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের আর কোন চেষ্টা করিনি। নিজেই নিজেকে বলেছিলাম, ‘ লেট ইট বি।’

আমাদের ডিভোর্স কার্যকরের বেশ কিছুদিন পর খবর পাই, মিলি বিয়ে করেছে। খোঁজ না নিয়েও জানতে পারি, যাকে বিয়ে করেছে সে ছিল মিলির বিড়াল পিংকুর চিকিৎসক। মিলি প্রায়ই সেই ডাক্তারের কাছ থেকে নানা বিষয়ে পরামর্শ নিত। সময় সময় আমার কাছে আরফান বা ইকবাল নামের ঐ ডাক্তারের বেশ প্রশংসাও করছে মিলি। আমি অনুমান করি, ঐ বিড়ালের চিকিৎসার সূত্র ধরেই মিলির সাথে সেই চিকিৎসকের একটা সখ্যতা তৈরি হয়েছে। মিলি পশু-পাখির প্রতি মমত্ববোধ আছে এমন একজন মানুষকে সংগী হিসেবে চেয়েছিল। আমার মধ্যে সেই প্রেমটা নেই বলে মিলি হতাশ হয়েছিল। মিলির বিয়ের খবর শুনে, অনুভব করেছিলাম, এবার হয়তো মিলি একজন প্রকৃত পশুপাখি প্রেমিক স্বামী পেয়েছে। মিলি হয়তো স্বামীর সহায়তায় আশেপাশের সব প্রানীকে সুস্থ্য করে তুলতে পারবে। মিলির সুখি-সুখি চেহারার ছবি কল্পনা করে আমি একটু হলেও সান্ত¡না পেয়েছি। মিলি যেমন সুস্থ্য হওয়ার পর পালিয়ে যাওয়া কোন প্রাণীর কথা স্মরণ করে দীর্ঘশ^াস ছেড়ে বলত, ‘ ভাল থাকলেই ভাল’ আমিও মনে মনে তাই বলি।
কিন্তু বছর না ঘুরতেই একদিন ‘ পেট লাভারস বিডি’ নামের পেইজে একটা পোস্ট দেখে চমকে উঠি। একটা বাড়ির বারান্দায় একটা বিষণ্ণ বিড়াল বসে আছে। তার নীচের ক্যাপশানে লিখা, ‘ এই বিড়ালটির নাম পিংকু। বয়স এক বছর সাত মাস। আমার ব্যক্তিগত চিকিৎসক মনে করে প্রেগন্যান্ট অবস্থায় বিড়ালের কাছে থাকা ঠিক না। তাই আমি এই বিড়ালটিকে এডপ্ট দিতে চাই।’
পিংকুর ছবি দেখে পোস্টদাতাকে চিনতে আমার ভুল হয় না। যে পিংকুর মায়াজালে আটকে মিলি একদিন আমার পশুপ্রেমকে অভিনয় বলেছিল সেই পিংকুর এই করুন দশা দেখে আমার মন খারাপ হয়। পিংকুর দিকে তাকালেই বুঝা যায়, বড় বেশি অযতœ আর অবহেলায় আছে সে। মিলি এবং মিলির পশুপাখি চিকিৎসক স্বামী যেভাবে তাকে রেখেছে তা দেখে মনে হলো, তাকে এডপ্ট না দিলে পিংকু নিজেই একদিন হারিয়ে যেতে বাধ্য হবে। যে বিড়ালের জন্য আমার জীবনে এত কিছু ঘটে গেল সেই বিড়ালকে এডপটেশনে দেয়ার চেষ্টা দেখে আমি একটু অবাকও হই। সময় কত নিষ্ঠুর। এক সময় এক প্রেমিকের জীবনের গতিপথ বদলে দেয়া শক্তিশালী বিড়ালটি আজ নিতান্তই অপাক্তেয়। মিলিরপোস্টটিতে লাইক পড়তে থাকে কিন্তু কেউই বিড়ালটিকে এডপটেশনে নিতে আগ্রহ দেখায় না। পোস্ট দেয়ার তিনদিন পরও কারো সাড়া না পেয়ে মিলি দ্বিতীয়বার পোস্ট দেয়। আবারও সেই শীর্ণ বিড়ালের ছবির নীচে লেখা, ‘ আজকের মধ্যে কেউ বিড়ালটিকে না নিলে আমি এটিকে রাস্তায় ফেলে দিতে বাধ্য হবো।’
এবার আমি নড়েচড়ে বসি। আমি অনুভব করতে পারি, শুধু প্রেগনেন্সি সংক্রান্ত জটিলতা নয়। আরো গভীর কোন সমস্যায় পড়েছে মিলি। কতটা সংকটে পড়লে মিলি পিংকুকে অন্যের হাতে তুলে দিতে চায় কিংবা পথে ফেলে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করে – তা আমি দূরে বসেও অনুমান করতে পারি। আমি ঠিক করি, আমি বিড়াল পুষি বা না-পুষি মিলিকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করবো।
এই পৃথিবীতে সবার কাছে সব জিনিসের মূল্য সমান হয় না। পিংকু হয়তো আজ মূল্য হারিয়েছে কিন্তু এক সময় সে মহামূল্যবান ছিল। এখন যে আমি নি:সঙ্গ সময় কাটাচ্ছি তা পিংকুরই দেয়া উপহার। মিলি চলে যাওয়ার পর প্রায়ই মনে হতো, পিংকুকে আমার আরো মনোযোগ দিয়ে দেখা উচিৎ ছিল। পিংকু হয়তো সাধারন কোন বিড়াল নয়। আমার পিংকুকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এবং মনোযোগ দিয়ে দেখার ইচ্ছে হয়। আমি আমার বন্ধু হাসিব যাকে মিলি কখনও দেখেনি তাকে দিয়ে মিলিকে ইনবক্সে নক করাই। মিলি সাথে সাথেই সাড়া দেয়। তারপর আমার সেই বন্ধু মিলির স্বামীর বনশ্রীর বাসায় যেয়ে হাজির হয়। মিলি বিড়ালটিকে হাসিবের হাতে তুলে দিতে গিয়ে কান্নায় ভেংগে পড়ে। তার কান্না দেখে, হাসিব বারবার জানতে চায়, এতই যখন কষ্ট পাচ্ছেন তখন বিড়ালটিকে অন্যের কাছে কেন দিচ্ছেন?
‘ আমার হাজবেন্ড এক সময় এলাউ করতো কিন্তু আমি প্রেগন্যান্ট হবার পর থেকে বিড়ালটিকে আর সহ্য করতে পারছে না। সামনে পড়লেই আঘাত করে। বিড়ালটাকে আঘাত করে সে এক ধরনের আনন্দ পায়। আমি প্রতিবাদ করেও তাকে দমাতে পারি না ’ বলেই মিলি আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে।
হাসিব মিলির দেয়া একটা ঝুঁড়িতে করে বিড়ালটাকে নিয়ে আমার বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলে মিলি চোখের জল মুছতে মুছতে জানতে চায়,‘ যিনি বিড়ালটি নিচ্ছেন তার ফোন নাম্বারটি কি কাইন্ডলি আমাকে দিবেন। আমি মাঝে মাঝে একটু ফোন করে পিংকুর খোঁজ নিতে চাই।’
সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ায় হাসিব। তারপর বেশ দৃঢ় ভাবেই বলে, ‘ আমার মনে হয় না, যিনি বিড়ালটিকে নিচ্ছেন তিনি আপনাকে বিড়ালের খোঁজ দিবেন।’ তারপর আমতা আমতা করে বলে, ‘ কারন তিনি বেসিক্যালি বিড়ালকে ঘৃণা করেন।’
‘তাহলে কেন নিচ্ছেন, তিনি’ বেশ উতলা হয়ে জানতে চেয়েছিল মিলি।
আমার বন্ধু হাসিব কাঁধে একটা ঝাঁকি দিয়ে অনিশ্চিত ভাবে মিলিকে বলে, ‘ সম্ভবত আপনাকে একটা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে চান তিনি। ’
মিলি আরেকটু চেষ্টা করলেই হাসিবের কাছ থেকে আমার নামটা জেনে নিতে পারতো। কিন্তু মিলি ইচ্ছে করেই যে লোকটি তাকে যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দিতে চায় তার নামটি আর জানতে চায়নি। বরং তার মুখে একটা স্বস্থির ভাব ফুটে ওঠেছিল।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *