শামছুল আরেফিন খান

আমার নিজের কথা বলার তেমন অভ্যেস নেই।আজও নিজের ঢোল নিজে পিটাবার জন্যে লিখছি না।আমি স্মরণ করতে চাই শহীদ হাসান নাসিরকে। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের নির্মম বলি হাসান নাসিরের কথা বলতে চাই। লাহোর দুর্গের ভিতর লাগাতার বেত্রাঘাত ও বর্বর প্রহারে তার মৃত্যু ঘটে। সামরিক শাসন সমস্ত প্রচার মাধ্যমের মুখে তালা ঝুলিয়ে রেখেছিল । তাই হাসান নাসিরের প্রান সংহারের কথা কেউ জানতে পারেনি। তার অপরাধ, তিনি সামরিক আইনের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে “আমার ভাইয়ের রক্তরাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কী ভুলিতে পারি” গানটি গেয়েছিলেন। লাহোরের রাজপথে নগ্ন পায়ে সাথীদের নিয়ে প্রভাত ফেরি করেছিলেন। বরকত সালাম রফিক জব্বার শফিউরের কথা বলেছিলেন। ৫২র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কথা বলেছিলেন।রাজপথ থেকেই গ্রেফতার করা হয়েছিল তাকে ।তিনি আর একটি বিস্ময়কর ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন।তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন।পাঞ্জাবের সংগ্রামী কৃষক নেতা মেজর ইসহাক , ন্যাপ নেতা মিয়া ইফতেখারউদ্দিন, কবি ফয়েজ আহমেদ , আইনজীবী নেতা মাহমুদ আলী কাসুরি প্রমুখ গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল নেতা তাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন। তিনি পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের আহবায়ক হয়েছিলেন। তার পরিচিতি কেবল এইটুকুই আমি জানি।আমি স্মরণ করতে চাই ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের ভিপি কাজী আব্দুল বারির কথা।সামরিক শাসনের বেত্রাঘাতে তার বধির হয়ে যাওয়ার কথা।বলতে চাই যশোর মাইকেল মধসূধন কলেজের ভিপি কাজী শহীদের কথা।তিনিও কারা নিরযাতন ও সামরিক শাসনের বেত্রাঘাতে জর্জরিত হয়েছিলেন।উত্তরকালে ন্যাপের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সামরিক নির্যাতনের ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি কখনও।আমার নিজের কথা বলতেই হয় কিছুটা । কারণ আমি ছিলাম তখন ঢাকা কলেজের ভিপি।আমি না আমরা। মাত্র কজন একসাথে পথচলা সাথী। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে আইবি পুলিশের সাথে ইদুর বিড়াল খেলেছিলাম।টরচের আলো জালিয়ে আমাদের খুজে পায়নি নিশাচর পুলিশ ও গোয়েন্দারা।কারন আমরা ট্রেঞ্চ বানিয়েছিলাম দেবে যাওয়া কবরগুলোকে।শিয়াল ডেকেছিল প্রচুর। কিন্তু কুকুর ‍গুলো ভেবেছিল তাদের ভয়েই শিয়াল ডাকছে। আমার সাথে ছিলেন গালাম মোহাম্দ ইদু। ইদুভাই। চেতনার প্রদীপ বহন করা একজন নীরব বিপ্লবী। বিড়ি শ্রমিক আন্দোলন থেকে উঠে এসেছিলেন। আমলিগোলার ভাট মসজিদের ইদুভাই এক কিংবদন্তি। তিনি স্বশিক্ষিত মার্কসবাদী তাত্বিক। দৈনিক সংবাদ তাকে সংশোধনী বিভাগের সাংবাদিকের চাকরি দিয়ে তার নতুন জীবিকার সংস্থান করে দিয়েছিল্ ভালো গান গাইতেন। উদীচীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা । বেশ অনেকদিন উদীচীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এখনও বেচে আছেন। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী সুপুরুষছিলেন যিনি তার নাম কমরেড লাট মিয়া । তিনি ইদু ভাইর সাথে বিড়ি শ্রমিক আন্দোলনে থেকে উঠে আসা স্বশিক্ষিত বিপ্লবী কর্মী।আর ছিল আমার কৈশোরের বন্ধু সহকর্মী শুভ রহমান। উত্তর কালের তুখোড় সাংবাদিক।দৈনিক জনকন্ঠের দীর্ঘ দিনের সহকারী সম্পাদক।এছাড়া ছিল অমল বিমল দুইভাই। বিমল পরে বিয়ে করেছিল কমরেডে আলী আকসাদের বোন চাপাকে।সবাই এরা কমরেড জ্ঞান চক্রবর্তীর হাতে গড়া আগুনের গোলা।আমিঋদ্ধ এদের সাহচরয ও সান্নিধ্যের কাছে।সামরিক শাসনের রক্তচক্ষুর পরোয়া না করে ফুলে ফুলে ছেয়ে দিয়েছিলাম আমরা আজিমপুর গোরস্তানে শহীদদের কবর।পোস্টারে ছেয়ে গিয়েছিল গারস্তান থেকে শহীদ মিনার।নগ্ন পায়ে প্রভাত ফেরি করেছিলাম বরকতে ভাগ্নিকে নিয়ে । আজিমপুর কলোনীর বাসিন্দা । চারুকলার একঝাক ছেলেমেয়ে গোরস্তান থেকে শহীদ মিনার পরযন্ত এঁকেছিল আল্পনা। আমরা ভয়ের কাছে হার মানিনি। ত্রাসে অবদমিত হইনি। অনেক নামকরা ছাত্রনেতা উকি মারতে এসে হিরো বনে গেলেন। ফুলের স্তুপ মাড়িয়ে শহীদ মিনারে উঠে দেখলেন মঞ্চ ক্রন্দন করছে তাদের জন্যে। তাদের মধ্যে মওদুদ আহমদ এখনও বেচে বরতে আছেন। ডাকসুতে অপিস পাহারায় ছিলেন একজন মাত্র গোল্ড মেডেলিস্ট সদস্য।তিনিও মঞ্চে ওঠেননি।বড় বড় ছাত্র নেতারা নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। আমি বলির পাঠা । সাজুগুজু করা নেতাদের মুখে ফুলঝুরি ফুটছে দেখে আমি এবং আমার সাথীরা সারা রাত জাগা ক্লান্তিতে নুয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে বিশ্রাম নিতে যেয়ে নিদ্রায় বিবস হয়েছিলাম।কিন্তু পরিত্রাণ পাইনি।সারাজীবন ভুগছি সেই ট্রমায়। আমি নির্বোধ কেন হাড়িকাঠে মাথা রাখলাম। এম-এল- আর এ কেন হাসান নাসিরের মত শত বেত্রাঘাত এবং ১৪ বছর RI খেলাম? ইতিহাসের কাছে একটা কৈফিয়ত তো দিতে হবে তার। তবে গল্পটা বড় করতে চাইনা।ছোট করেই বলে রাখি।ফেব্রুয়ারি মাস আসলো। ছাত্র ইউনিয়নের অফিসটা তখনও আমার নিয়ন্ত্রনেই ছিল। মাসে মাসে ভাড়াটা আমিই একজন ডোনারের কাছ থেকে সংগ্রহ করে বাড়িওয়ালার হাতে তুলে দেই বলেই আমরা বেদখল হইনি।দফতরের দায়িত্ব কাজী জাফরকে বুঝিয়ে দিয়েছি। কিন্তু সম্পাদক মন্ডলির সদস্যপদটা ছাড়িনি। এসব কারণে সামরিক শাসন জারির সাথে সাথে আকাশটা আমার ঘাড়েই ভেঙে পড়লো। দেশের সবচেয়ে নামকরা কলেজের ভিপি। সবাই সেখানে সেরা ছাত্র।আমি হংস মাঝে বক সম। তবু নামডাকটা ছিল। বড় নেতারা সব গা ঢাকা দিয়েছেন। সভাপতি ডা. খন্দকার মো. আলমগীর ও সাধারণ সম্পাদক সাদউদ্দীন লাপাত্তা। আমি ভারপ্রাপ্ত হয়ে পড়েছি সব কিছুর।ছাত্রলীগের গোয়ালও শূন্য । ড. নিউম্যানের আশীর্বাদপুষ্ট নেতারা আইয়ুবের ঠ্যাঙাড়ে দলে নাম লিখিয়ে ছড়ি ঘুরাচ্ছে। আমার স্কুলের বন্ধু আবুল হাসনাত,কলেজের ও জেলের বন্ধু আনোয়ার অনসারী খান,জেলের বন্ধু এ আর ইউসুফ আইয়ুবের প্রধান লাঠিয়াল হয়েছেন । ডাকসুর ভিপিছিলেন কে তখন, সেকথা মনে নেই। তবে জিএস ছিলেন ওলি আহাদের ভাই আমিরুজ্জামান। দুজনেই সিএসপি হয়েছেন। অন্যরা সব গায়েবুল মুলক বদিউজ্ঝামান। সদস্য মহোদয় অঙ্কের গোল্ড মেডেলিস্ট। নামটা খুব সম্ভব ফজলে আহমদ।পরবর্তী কালে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি। তার সঙ্গে দেখা করলাম। নিয়ম ও ট্রাডিশন মত ডাকসু অপিসে সর্বদলীয় মিটিং ডেকে একুশের সর্ব সম্মত কর্মসূচি প্রণয়ন করার কথা। মিটিং ডাকা হ’ল । কিন্তু পর পর দুটো মিটিঙে কেউই আসলেন না।তৃতীয় মিটিঙে উইমেন্স হলের ভিপি ফওজিয়া সামাদ আর জিএস জিন্নত আরা আসলেন।সলিমুল্লাহ হলের ভিপি হুমায়ুন কবিরআসলেন। তিনিও ফরেন সার্ভিস পেয়েছেন। কাজেই গায়ে কাদা মাখাবেন না।সেটা খোলাখুলিই বললেন। ঢাকা হলের ভিপি জিএস এনয়েতুল্লাহ খান ও তাহের উদ্দিন ঠাকুর একেবারেই নট নড়নচড়ন আবস্থায় আধা আন্ডারগ্রাউন্ড।কোন মতেই ছাগলকে টেনে হেচড়ে পানির কাছে আনা গেলো না। অগত্যা মধুসূদন দুই প্রীতিলতাকে স্বাক্ষী রেখে একুশ পালন মানে আইন অমান্য করার নিদ্ধান্ত নেওয়া হ’ল ঢাকসু সদস্য মহোদয়ের সভাপতিত্বে।রাশেদ খান মেনন ছিল আমার ইউনিয়নের নির্বাহী কমিটির সদস্য। তাকেও পেলামনা । হাওয়ার বিপরীতে গুনটানার পুরো মাশুলটাই গুনছি আমি সারা জীবন ধরে। এল এল বি পরীক্ষাটাও আটকে গেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কালাকানুনে ।জীবনের মোড় ‍ঘুরে গেলো।হতে চেয়েছিলাম ডাকসাইটে উকিল । হলাম ছাপোষা সাংবাদিক।

লেখক: কলাম লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *