–শামসুল আরেফিন খান
করণা কোভিড শুধু যে মানুষের জীবনটাকেই ওলোট পালট করে দিয়েছে তাই না ইতিহাসকেও জোরে ঝাঁকি দিয়েছে। পাশ্চাত্যের শিল্প বিপ্লব একসময় সামন্তবাদের খুটিগুলো হেচকা টানে নড়বড়ে করে দিয়েছিল।দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সমাজের নীতিকাঠামোর শিকড় কেটে ফেলেছিল । গণবিবেককে অফিঙের নেশায় বুঁদ করে দিয়েছিল। সেই সব ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই , সাম্যবাদী স্বরূপ নিয়ে কোভিড করোণা এবারে পুঁজিবাদের শিকড় ধরে টান দিয়েছে।পুজিবাদ মুখ থুবড়ে পড়া বাজার অর্থনীতির শিয়রে বসে তিন চার ট্রিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা সিলিন্ডার নিয়ে হাঁসপাশ করছে।ভুমিকম্প হানা দিয়েছে পুজিবাদের ঘর সংসারেও। গৃহদাহের আঁচে পুড়ে বিলগেট দম্পতি বিবাহবিচ্ছেদের দরখাস্ত নিয়ে আদালতের দারস্থ হয়েছেন।এমাজনের ঘর ভেঙেছে গোপন পরকীয়ার ছোবলে । তৃতীয় শীর্ষ পুজিপতি অরেণ বাফেট তার ধনরত্ন আলেকজান্ডারের মত রাস্তায় ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছেন যাতে তিনিও অন্তিম যাত্রার সময় দুহাত কফিনের বাইরে বের করে রেখে বলতে পারেন যে দেখ মর্তবাসী আমি নিঃস্ব হয়ে খালি হাতে কবরে যাচ্ছি।
এমনি আরও অনেক বিপরযয় পুজিবাদের উঠোনে অলিন্দে বিচরণ করছে। চৌকাঠেও আসন পেতে বসেছে।
ইউরোপ আমেরিকার পর এবার ভারতবর্ষ বিষধর করণার দংশনে লখিন্দরের মত নীল হয়ে অক্সিজেন সঙ্কটে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ছটফট করছে।প্রজন্ম গভীর ক্ষোভ ও বেদনার সাথে প্রশ্ন তুলছে ভারত ভাঙা নিয়ে। পুর্বসূরিদের কাছে জিজ্ঞেস করছে কোন অধিকারে তোমরা ভারত ভাগ করলে? কৈফিয়ত তলব করছে পূর্বপুরুষের কাছে, কে দিলো তোমাদের বাংলাকে জবাই করার অধিকার? তাদের যুক্তি অকাট্য। ৪৬-৪৭ এ ভারত যখন ভাগ হ’ল তখনও অনুযোগ উঠেছিল একটু নরম সুরে। “তেলের শিশি ভাঙলে পরে খোকার উপর রাগ কর । তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ কর । তার বেলা !তার বেলা?” কিন্তু এবারে প্রজন্মের কন্ঠে যেন জাগছে গরম সুর। যুক্তিও অকাট্য। পাঞ্জাব সিন্ধু বেলুচিস্তান ও পাঠানদেশ তো বলেনি ভারত ভাগ করতে। কেবল বাংলাই ভোট দিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষ্যে। তারাও লড়াই করে বেরিয়ে এসেছে। ভারতে এখন ৩০ কোটি মুসলমান রয়েছে। খেয়ে পরে সমান অধিকার নিয়ে ভোটের বাজারে দর কষাকষি করে বেচেবরতে আছে। তাদের জন্যে কী ভারত ভেঙে তোমরা গড়ে দেবে আর একটা পাকিস্তান?
ডিজিটাল প্রযুক্তি ইতিহাস ও ভুগোলের গড়া পাচিল ডিঙিয়ে এপার ওপারের মিলন মেলা গড়তে পারঙ্গমতা দেখাচ্ছে।কাটাতারের বেড়া ফেলানিদের ঝুলিয়ে দিতে পারলেও সাংষ্কৃতিক অঙ্গনে পুনঃপুনঃ ভার্চুয়াল
মহাসঙ্গমকে বাধাগ্রস্ত করতে পারছে না। সিডনি টরেন্টো নিউইয়র্ক লন্ডন দিল্লী ঢাকা ব্যাপী বর্ডার লেস মিলন ক্ষেত্রে সাংষ্কৃতিক সম্মিলন ঘটছে বিশ্ব বাঙালির।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেওলিয়াপনা ও মৌলবাদ-জঙ্গীবাদের দুর্বিনীত উত্থানের পটভূমিতে ভারতবর্ষের সব“বার্লিন প্রাচীর “ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা ক্রমেই উজ্জল হয়ে উঠছে। যদি প্রশ্ন করা হয় ভারত ভাঙার প্রধান কুশিলব কে ছিল? এই প্রশ্নের উত্তরে একবাক্যে সবাই বলবে, মুসলিম লীগ ও তার শিরমনি জিন্নাহ। অবশ্যই জিন্নাহ এবং ব্রিটিশ। কিন্তু নেপথ্য কারিগর যে ছিলেন মোহনলাল করমচাঁদ গান্ধী সেকথা নিয়েও
এখন ফিসফাস গুঞ্জন বাড়ছে। সারা ভারতের মানুষ, বিশেষ করে বাংলার মানুষ, নেতাজীর অন্তর্ধানের জন্যে গান্ধী নেহেরুকে দোষারোপ করতে শুরু করেছে। সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী শাসকদল এই সংশয় থেকে রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছে ।
প.বাংলার সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে(২০২১) জনগন কংগ্রেস ও সিপিএমকে হোয়া্ট ওয়াশ করে ছেড়েছে। কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনকালে গান্ধীজির রাষ্ট্রপিতার মরযাদাকে সংবিধানসিদ্ধ করা হয়নি। বিজেপি সেই সুযোগে তাঁকে খর্ব করে তাঁর চির প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাজী সুভাষ বসুকে স্যেকুলার অবস্থান থেকে সরিয়ে এনে হিন্দুত্ববাদী জাতীয় বীরের মরযাদায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস রাখছে।প্রসঙ্গতঃ একথাও আলোচনায় উঠে আসছে যে বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাগ্যেও একই পরিণতি নামতে পারে। কারন স্বাধীনতার সুবর্ন জয়ন্তি পালিত হয়েছে ।কিন্তু যে মুক্তিবাহিনীর ত্যাগে অর্জিত স্বাধীনতা তার কপালে ৫০বছরে সাংবিধানিক স্বীকৃতি জোটেনি। তাদেরকেও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা কঠিন হবে না।
যে ঘরামী পাড়া পড়শির ঘরের ছাদ ছেয়ে বাঁচে তার কপালেই ছাদ জোটে না। যে মা নিজের রক্ত পান করিয়ে সন্তানকে বাচিয়ে রাখে, যে বাবা জীবনপাত করে ছেলেমেয়েদের লালন করে তারা শেষকালে বৃদ্ধাশ্রমে বসে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করে। এটাই এখন সমাজের নিয়মহয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিতে গান্ধী জিন্নাহ মুজিবের মত জাতির জনদের ভাগ্য আরও করুন। মুক্তিযোদ্ধা কেমন করে ব্যতিক্রম হবে? প্রজন্ম ভাবছে হয়ত সে কথাও।
বিজেপি রাজনৈতিক কারণে গান্ধীকে খর্ব করার প্রয়াস রাখছে। তাকে ব্রিটিশের সাঙাত বলে সন্দেহের তীরবিদ্ধ করা হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস অমোঘ , ক্ষমাহীন। একদা দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা নিগ্রীহিত গান্ধী ব্রিটিশের মানদন্ডে মহাত্মা হলেন কী করে ? কেন তিনি তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরামের দেশপ্রেমকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তার প্রাণরক্ষার আবেদনে শরীক হলেননা? কেন তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগের নির্মম গণহত্যার পর খেলাফতের গলা ধরে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবের আগুন নেভাতে গঙ্গা জল ও জমজমের পানি একই কমুন্ডুলে করে বিপ্লবের অনলধারায় ঢেলে দিয়ে ব্রিটিশকে বাচিয়ে দিলেন? কেন তিনি ভগৎ সিং ও তার বিপ্লবী সাথীদের প্রাণ রক্ষা করতে বড়লাটের কাছে আবেদন জানাতে সম্মত হলেন না?কেন রাজনীতিতে ধর্ম আমদানি করে জিন্নার মত স্যেকুলার লোকদের কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিলেন? ক কেন ধর্ম নিরপেক্ষতার জলাঞ্জলি দিয়ে ইসলামী শরীয়া আইন ও আল্লার শাসনকামী খেলাফত আন্দোলনকে পার্টনার করে অসহযোগ আন্দোলনের নামে ব্রিটিশ তোষণে ব্রতী হলেন? এসব প্রশ্নের সমাধান খুজতে শুরু করেছেন নতুন প্রজন্মের গবেষকরা ।
মহাত্মা গান্ধীকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হলে কী করতে হবে সে পন্থা জ্ঞানীজনদের দীক্ষায় অভাজনের নাগালের মধ্যে এসেছে সামান্য একটুখানি।
সেই দিশায় সত্য সন্ধানে যেতে হবে ইতিহাসের অন্য এক প্রেক্ষাপটে। সেখানে আছেন একজন ধর্মযাজক। তাঁর নাম. জর্জ গ্যাপন। তিনি রাশিয়ার অত্যাচারি রাজা (জার) নিকোলাসের এজন্ট হয়ে শোষিত নির্যাতীত শ্রমিকদের দরদী বন্ধুর ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন।তিনি শ্রমিকদের বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে স্বয়ং ঈশ্বর জার নিকোলাসকে দেশ শাসন করার দায়িত্ব দিয়েছেন। জার কোন অন্যায় করতে পারেন না।‘ওম শান্তি’ । সবাই মাথা নত করে জারের সামনে গিয়ে কষ্টের কথা বলে হাত পাতো। ঈশ্বর চানতো(ইনশাল্লাহ)তিনি তোমাদের প্রার্থনা মনজুর করবেন।
রাশিয়ার আকাশে তখন বলশেভিক বিপ্লবের মেঘ গুড় গুড় করছে।রাশিয়ার আধপেট খাওয়া শ্রমিক কৃষকরা যাতে সেই মঙ্গল বর্ষণ ধারায় স্নাত হয়ে শ্রমিক একনায়কত্ব কায়েমের স্বপ্ন না দেখে ফেলে, তার জন্যেই ফাদার জর্জি গ্যাপনকে মহাপুরুষ সাজিয়ে শ্রমিক কৃষকদের অভিভাবক বানিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ পাহারায় তিনি শ্রমিক সমাবেশ ঘটাতেন। তিনি যে জারের উপর প্রভাব খাটাবার ক্ষমতা রাখেন তেমনটি ভেবে অসহায় মানুষ তাকে আকড়ে ধরে । তার ডাকে জনসমাবেশ বড় হতে থাকে।
সেকালে সকল ক্ষমতা ছিলো জারকেন্দ্রিক। পার্লামেন্ট বা সংবিধান বলতে কিছুই ছিলো না । জারের নির্দেশ মতোই ঘটতো সবকিছু।জনসাধারণের উপর জারবাহিনীর অত্যচার তো তখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। জারের এই স্বৈরদলনে ধীরে ধীরে জনমনে ক্ষোভ জন্মাতে শুরু করে।১৯০৪ সালে জাপান-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়তে থাকায় এই ক্ষোভগুলো আরো বৃদ্ধি পায় ।
‘জাপান-রাশিয়া’ যুদ্ধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পেলো। রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা করুণ হতে শুরু করলো।। একে তো শ্রমিকদের উপর মালিক পক্ষের অত্যাচার, কারখানায় অমানবিক পরিশ্রম করেও দুবেলা ভরপেট খাওয়ার জোটেনা, তার উপরে আবার নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য মূল্যের উর্ধগতি। শ্রমিকদের ক্ষোভ আরও বেড়ে গেলো। ক্ষোভ যত বাড়ছিলো শ্রমিকরা ততই দ্রুত সংগঠিত হতে শুরু করলো। শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকায় সংগঠনগুলোও শক্তিশালী হয়ে উঠলো।
ক্ষোভের আগুনে ঘৃতহুতি ঘটলো ১৯০৪ সালের ডিসেম্বরে ‘পুটিলভ ইস্পাত কারখানার ৪ জন কর্মী বরখাস্ত হওয়ায়। তারা – ‘Assembly of Russian Workers’ নামক সংগঠনের সদস্য ছিল।এই শ্রমিক ছাটাই এর প্রতিবাদে প্রায় দশহাজার কর্মী সেন্ট পিটার্সবার্গে ধর্মঘট শুরু করে। ধর্মঘটী শ্রমিকদের নিয়ে ফাদার জর্জি গ্যাপন শান্তিপূর্ণ অহিংস আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করেন। তাদের মতামত ও সমস্যাগুলোকে নিয়ে ফাদার জর্জি গ্যাপন একটা পিটিশন লেখেন। তাতে শ্রমিকদের কাজের অবস্থার উন্নতি, মজুরি বৃদ্ধি ও কার্যদিবস ৮ ঘন্টায় হ্রাস করানো ,রুশ-জাপান যুদ্ধের অবসান এবং সার্বজনীন ভোটাধিকার ব্যবস্থার দাবিও অন্তর্ভুক্ত ছিলো। সেই পিটিশন নিয়ে ২২ জানুয়ারি, রবিবার , জারের শীতকালীন প্রাসাদের উদ্দেশ্যে পদযাত্রার পরিকল্পনা তৈরি করা হ’ল। শ্রমিকরাও সেই ছলনায় ভুলে আশায় বুক বাঁধলো। নির্দিষ্ট দিনেই গ্যাপনের নেতৃত্বে শ্রমিকরা সেন্ট পিটার্সবার্গের শিল্প উপ-অঞ্চলে ৬টি পয়েন্টে জড়ো হয়ে শীতকালীন প্রাসাদের দিকে এগোতে শুরু করে। এই বিক্ষোভে জড়িতদের সংখ্যা অনুমান করা হয় প্রায় ৫০,০০০। তারা একেবারে নিরস্ত্র ছিল।
The New York Herald ও The NY Times পত্রিকার খবরে বলা হয়
যে তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলো যেমন বলশেভিক, মেনসেভিকস এবং সামাজিক বিপ্লবীরা রাজনৈতিক দাবীর অভাবে মিছিলটি প্রত্যাখ্যান করেছিলো। তাদের মতে শীতকালীন প্রাসাদে পদযাত্রা কোনোও বিপ্লবী বা বিদ্রোহী কাজ ছিলো না ।তাছাড়া নির্দিষ্ট এই দিনে জার নিকোলাস প্রাসাদে উপস্থিত ছিলেন না ।২১ শে জানুয়ারি তিনি মন্ত্রি পরিষদের সভায় যোগ দেয়ার জন্য সারসকোয়ে সেলোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এই নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীরা যখন প্রাসাদের দিকে এগোচ্ছিল তখন সেখানে বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় দশহাজার সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিলো৷সেনা অফিসাররা বিক্ষোভকারীদের প্রাসাদ চত্বরে প্রবেশের আগে থামতে বললেও তারা এগিয়ে যেতে থাকে। পরে অফিসাররা তাদেরকে ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়ে এগোবার কথা বলে । তারা সে কথাও শুনলো না। একইভাবে এগিয়ে যেতে থাকলো। কিছুক্ষণের মধ্যে কোসাকস, পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাদের উপর গুলি চালাতে শুরু করে। মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং হতাহতদের ফেলে যে যার মতো পালিয়ে যায়। ফাদার গ্যাপন নিজেও সমাবেশের পরে রাশিয়া ছেড়ে পালিয়ে যান।সেদিন ছিল ২২ জানুয়ারি রোববার। ইতিহাসে যার পরিচিতি ঘটেছে ব্লাডি সানডে নামে।
The NY Times এর খবরে বলা হয়,২২ জানুয়ারি এই গোলাগুলির ফলে ১৪৩-২৩৪ জনের মৃত্যুসহ ৪৩৯-৮০০ জন হতাহত হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। জানুয়ারি মাসে প্রায় ৪,১৪,০০০ মানুষ কাজ বন্ধ করে দেয়।ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে ছাত্ররা ধর্মঘটে নামে।, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিলসহ সর্বসাধারণেরা অর্থাৎ সব পেশার মানুষেরাই আন্দোলনে নেমে পড়ে এই ঘটনাটির পর। এমনকি রাশিয়ার নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজও জারশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে (এই নৌবাহিনীর বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে পরিচালক সার্গেই আইজেনস্টাটন ‘ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন’ নামক একটি চলচিত্রও নির্মাণ করে।) এই সকল বিদ্রোহী তাদের নাগরিক অধিকারের জন্য সংবিধানের দাবি করে। পরবর্তীতে এতো মানুষের চাপে জার ঘটনাটিকে বেদনাদায়ক বলে আখ্যায়িত করে ডুমা (রাশিয়ান পার্লামেন্ট) গঠন করেন এবং নানা কৌশলে আন্দোলনটা থামানোর চেষ্টা করেন। প্রথম দুটি ডুমা বাতিল করা হয়। তারপরে লিবারেল এবং বিক্ষোভকারী কাউকে না নিয়ে নিজের পছন্দমত, জার তার তাবেদার ও বশংবদ রাজনীতিবিদদের নিয়ে ৩য় ডুমা গঠন করেন। আর এই কারণেই ৩য় ডুমাটিই তাদের ৫ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে সক্ষম হয় । ডুমা তৈরির পর পরই জার একের পর এক শ্রমিক সংগঠনগুলো নিষিদ্ধ করে দিয়ে পুনরায় সকল কিছুর কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নেন। এভাবে আস্তে আস্তে পুরো আন্দোলনটা থামিয়ে দিতে সক্ষম হন জার দ্বিতীয় নিকোলাস।
ফাদার গ্যাপন ছিলেন জবরদস্ত সংগঠক এবং তুখোড় বক্তা।তিনি রাশিয়ার শহরগুলোতে নিম্ন বিত্ত খেটেখাওয়া মানুষের সুখ দুঃখের দেখভাল করতেন। শ্রমিক আন্দেলন ও ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন নিষিদ্ধ ছিল। তবু গ্যাপন সেন্ট পিটার্সবুর্গ শহরে ১৯০৩ সালে তার নেতৃত্বাধীন শ্রমিক সংগঠন “রাশিয়ার মিল ফ্রাক্টরি শ্রমিকদের এসেব্লি “গড়ে তুলতে কোন বাধা প্রাপ্ত হননি। তার পৃষ্ঠপোষক ছিল উর্দিপরা পুলিশ এবং শহরটির গোপন পুলিশ “ওখরাণা” ।সরকারের সাথে তার দহরম মহরম টের পেয়ে উগ্রপন্থী ও অতি ধার্মিক শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত মানুষ দলে দলে তার সংগঠনে যোগ দেওয়ায় সেটা ১৯০৪ সালে একটি বিশাল ও শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয়। তার সংগঠনের লক্ষ্য ছিল গরীব মানুষের স্বার্থ দেখা এবং তাদের শান্ত নম্র ধার্মিক এবং রাজভক্ত করে গড়ে তোলা। সে কাজে তিনি পারঙ্গমতা দেখাতে পেরেছিলেন। ১৯০৫ সালে ইস্পাত কারখানায় শ্রমিক ছাটাই জনিত কারণে ৩৮২ কারখানায় দেড়লক্ষাধিক কর্মী ধর্মঘট শুরু করে। শহরে কোন বিদ্যুত ছিল না। সংবাদপত্র বের হচ্ছিল না। শহরে পুরো হরতাল চলছিল।সেই পরিস্থিতি সামাল দিয়ে অসন্তোষ প্রশমনের জন্যে গদ গদ সুরে রাজভক্তি দেখিয়ে শ্রমিকদের দাবি দাওয়া সম্বলিত অর্জিপত্র রচনা করেছিলেন ফাদার গ্যাপন। সেই দরখাস্ত নিয়ে তিনি ধর্মঘটী শ্রমিকদের রাজ দরবারে হাটু গেড়ে বসাবার ইচ্ছা নিয়ে ২২জানুয়ারি ১৯০৫ উইন্টার প্যালেসে শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ধর্মঘটী শ্রমিকরা সপরিবারে জায়গায় জায়গায় এসে ২ দিন আগে থেকে সমবেত হচ্ছিল। তাদের হাতে ছিল ধর্মীয় প্রতীক আঁকা ও “ঈশ্বর জারের কল্যান করুণ” লেখা ফেস্টুন । কিন্তু সেই তোষামোদের অস্ত্র অকারযকর হয়ে বুমেরাঙ হওয়ায় ভন্ড ধর্মগুরু গ্যাপনকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।
জানুয়ারি মাসের ধর্মঘটে বিভিন্ন শহরে ৪৪০,০০ মানুষ অংশ গ্রহন করে। জার নিকোলাস গণতন্ত্র দেয়ার ভান করে ভাঙাগড়ার ভিতর ৩টি ডোমা বা বিধান সভা গঠন করেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হ’লনা। ধর্মঘট থামলো না বরং পরিধি আরও বাড়লো।।অক্টোবর ১৯০৫ ও এপ্রিল ১৯০৬ আনুমানিক ১৫০০ (পনের হাজার) শ্রমিক কৃষক হয় ফাসিতে ঝুলে বা গুলি খেয়ে মারা গেলো। আহত হ’ল ২০,০০০ বিশ হাজার এবং প্রায় ৪৫, ০০০ মানুষকে নির্বাসনে যেতে হ’ল।শণিতসিক্ত রোববারের সব থেকে বড় প্রতিক্রিয়া হ’ল এটাই যে খেটে খাওয়া মানুষের জারপ্রীতি ছুটে গেলো এবং তাকে ঈশ্বরের দোসর ভাবা মোহভঙ্গ হ’ল।
পাঠক আমার মনে হয় ইতিহাসের দর্পনে এখন রাশিয়ার রাজভক্ত ধর্মগুরু গ্যাপনের মধ্যে ভারতবর্ষের অহিংসা মন্ত্রের ঋষি সত্যাগ্রহ আর অসহযোগের নায়ক মহাত্মা গান্ধীকে খুজে পাওয়া কিংবা গান্ধীর মধ্যে গ্যাপনকে খুজে পাওয়া তেমন কষ্টকর বা কঠিন হবে না।ভিন্ন প্রেক্ষাপটের দুজন ভিন্ন মানুষের অবয়বে তো পার্থক্য থাকবেই । তবে লক্ষ্য ও দর্শন মননে তাদের সাদৃশ্য এবং অভিন্নতার বিষয়টি আর কোন প্রমানের অপেক্ষা রাখে না।রাশিয়ার ব্লাডি সানডের সাথে ভারতবর্ষের জালিয়ান ওয়ালাবাগের গণহত্যা ও তার পার্শপ্রতিক্রিয়ার মধ্যেও অনেক মিল রয়েছে।
লেখক: বঙ্গবন্ধুর মিডিয়া সমন্বয়ক, ভাষা সৈনিক,মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক- কলামিস্ট।