শামসুল আরেফিন খান
“…নদী বললে, এই মঙলি তুই বলিস কী? //মইরে গেলে তো হাইরে গেলি //…যাহ আজ তোর সব //ময়লা ধুইয়ে দিলাম….মাথা উঁচু কইরে উঠ্ । তুই যা রুখ্যা দাড়া মঙলি । তুই রুখ্যা দাড়া।”….
প্রিয় পাঠক,আমরা এই এপার বাংলার বাঙালিরা দু’দু’বার স্বাধীন হয়েছি । কিন্তু শাপমুক্ত হইনি কারণ আমরা পাপমুক্ত হইনি। আমরা মনের মধ্যে পাপকে পুষে রেখেছি । ঘাড়ে পিঠে করে একাত্তরের পাপকে বয়ে বেড়াচ্ছি । সেই পাপ দিয়েই আমরা পিতৃহত্যা করেছি। সেই পাপ এখন আমাদের বুকের উপর ধেই ধেই করে নৃত্য করছে। একাত্তরের সে পাপ কখনও মওলানা সিরাজুদ্দৌলার বেশে দেখা দিচ্ছে। কখনও মুফতি মামিনুল হকের স্বরূপ নিয়ে আবির্ভুত হচ্ছে। নিপীড়িত হচ্ছে কত শত শিশু । নিরযাতীত হচ্ছে কত কত নারী। আমরা একাত্তরের অল্প ক’জন পাপীকে মাত্র নির্মূল করতে পেরেছি। কিন্তু পাপকে মাথার তাজ বানিয়ে রেখেছি পূজার নৈবেদ্য দিয়ে। সেই পাপ যখন মাহিমা ফাহিমা পূজা শীলের সাথে আরও শত শত ভিকটিমকে দলিত মথিত নিষ্পেষিত করে নিষ্প্রাণ করেছে। আমরা সয়ে গেছি। সেই পাপ নব ব রূপেআত্মপ্রকাশ করছে।নতুন নতুন অবস্থান তৈরী করছে। নতুন তার লেবাজ। চক চকে চেহারা। পাপীর হাত ধরে হাটছে তার নামী দামী কতক কলমবাজ দোসর। পিঠে তাদের টাকার বোঝা। হাতে প্রভু বন্দনার অর্ঘ্যথালা।
আমি ভাবছিলাম জোয়ান ।অফ আর্কের কথা।৩০ শে’২১ মে, ফরাসী বীরকন্যা জোয়ান অব আর্কের (১৪১২-১৪৩১) হত্যার ৫৯০তম বার্ষিকী। পূর্ব ফ্রান্সের একটি সামান্য কৃষকের ঘরে জন্মানো জোয়ান ফরাসী সেনাবাহিনীর জন্য বিরল যুদ্ধজয় এনে দিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই ফ্রান্স জিতে নেয় তাদের বেহাত হয়ে যাওয়া ভূমি। অনেকের ধারনা জোয়ানের ভবিষ্যত দেখার ঐশ্বরিক ক্ষমতা ছিল। তিনি সপ্তম চার্লসের ক্ষমতারোহণের পেছনেও পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন।দেশের এত গৌরব বয়ে আনা সত্বেও তাঁকে বার্গুনডিয়ানরা আটক করে ইংরেজদের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখানে ধর্ম ব্যবসায়ী পাদ্রীরা ফ্রান্সের মুক্তিদাত্রী জোয়ান অব আর্ককে ডাইনী ফতোয়া দেয়। তারপর সর্বসমক্ষে তাঁকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। সে সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯।
তাঁর মৃত্যুর ২৪ বছর পর সপ্তম চার্লসের উদ্যোগে পোপ তৃতীয় ক্যালিক্সটাস তাঁর পুনর্তদন্তে জোয়ানকে নির্দোষ সাব্যস্ত করেন। তখন তাঁকে শহীদের মর্যাদা দেয়া হয়। বাঙালি বীরকন্যা নুসরাতকেও আমি শহীদের মরযাদা দেওয়া সঙ্গত মনে করি। কারণ সে যে দুর্বার লড়াই করেছে মৌলবাদী দানব আল্লামা মুফতি মাওলানা ও হাই মাদ্রাসার নারী ললুপ অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলার রাক্ষুসে থাবার বিরুদ্ধে, তার একটি কালজয়ী স্বরূপ রয়েছে। মৃত্যুর আগ্রাসনের কাছে তার পরাজয় ঘটেছে। কিন্তু সে বাচার জন্যে প্রাণপন লড়েছে। প্রথম লড়াই ছিল তার নারীদেহগ্রাসী মানবরূপী দানবটার বিরুদ্ধে। সেখানে সে হার মানেনি। পৃথিবীকে সে জানিয়ে দিয়েছে শয়তানের দোসর ধর্মগুরুদের বজ্জাতির কথা। শয়তানটাকে এখন ফাসির জন্যে প্রহর গুনতে হচ্ছে। আইন কাউকে ক্ষমা করেনা সমাজে তার দাপট যত প্রবলই হোক না কেন্। প্রকাশ্য প্রদোষালোকে গায়ে কেরোসীন ঢেলে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারা হ’ল। সে বাচার জন্যে ধস্তাধস্তি করলো ঘাতকদের সাথে। তার এই প্রতিরোধ সংগ্রাম তার মত হেজাব পরা অন্য মাদ্রাসা ছাত্রীদেরকেও আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করার সাহস জোগাবে। আর একটা কথা হ’ল যে নুসরাতের হত্যাকান্ড যদি কোন অন্ধকার ঘরে লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটতো তা হলে প্রাথমিক ধারণায় তদন্তকারী পুলিশ বলে দিত এটা আত্মহত্যা। অপরাধির দৃষ্টান্তমূলক সাজা হতে শীতলক্ষ্মা বুড়িগঙ্গা থেকে অনেক ঘোলাজল বঙ্গোপসাগরে গড়াতো। আদালতের কাঠগড়ায় মৃত নুসরতের মহান বিজয় ঘটেছে। আমি তাই নুসরতকেও এক মহান শহীদ নারীযোদ্ধা মনে করি। সে এক জাগ্রত নারী বহ্নিশিখা।
জোয়ানের শাহাদাত বার্ষিকী যেতে না যেতেই রেডিওলজিস্ট সাবিরা রহমান লিপিকে কে বা কারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে আগুনে পুড়ে আত্মহত্যার নাটক সাজাবার ব্যার্থ প্রয়াস পেয়েছে। লিপি ফন্ট লাইনের যোদ্ধা বিশ্বব্যাপী মানবজাতির মহাশত্রু কোভিড করণা ভাইরসের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে। গ্রীনরোডের গ্রীনলাইফ হাসপাতালে কর্মরত এই নারী যোদ্ধা ৫০/১ কলাবাগান ফাস্ট লেনেআলাদা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাস করছিলেন ১ জানুয়ারি ২০২১ থেকে। তার ২য স্বামী ব্যাঙ্কার শামসুদ্দিন আহমদ থাকেন এক ছেলেকে নিয়ে পুরাণপল্টনের অন্য একটি বাসায়।
করোণাকালে সম্মুখযোদ্ধা চিকিৎসাকর্মীরা অনেকেই পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপদ রাখার জন্যে এই বিচ্ছিন্নতায় স্বতঃস্ফূর্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। ইংরেজিতে বলা যায় ‘ভলেন্টিয়ার’ করেছেন। বিশ্বব্যাপী শত শত চিকিৎসক ও তাদের পেশার অন্য শাখার কর্মীরা প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁরা সবাই শহীদ হয়েছেন। জার্মস এবং ভাইরাস মানুষের প্রাচীণতম প্রতিবেশী এবং আদিম শত্রু। বীজানু ও ভাইরাস আগে না মানুষ আগে তা নিয়ে বিতর্ক হয়ত কোনদিনও শেষ হবেনা। বলা হয়ে থাকে, চিকিৎসা শাস্ত্রের জন্মই হয়েছে এই যুগল ও তাদেন নিকটতম প্রতিবেশি ‘এলার্জি’কে পরাজিত করার জন্যে। করোণা ভারাসের মত মানবজাতির বহু প্রাকৃতিক শত্রুর বিরুদ্ধে অনেক মহাযুদ্ধে বিজ্ঞান জয়রাভ করেছে। কিন্তু বিজ্ঞান মানুষের অপর এক শত্রু, ‘গুপ্ত ঘাতকদের’ আগেভাগে পাকড়াও করার কোন মোক্ষম অস্ত্র আবিষ্কার করতে পারেনি। ষড়যন্ত্রকারীদের ফোনালাপ ক্যাচ করার যে পন্থা বা প্রযুক্তি এখন ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী জনগনের দুষমন ইসরাইলের কব্জায় রয়েছে তা বাংলাদেশের জন্য সহজলভ্য হয়নি।কূটনৈতিক জটিলতায় ফেঁসে আছে। সে সব পেতে হাতটাকে কানের পিছন দিক দিয়ে ঘুরিয়ে আনতে হচ্ছে। অপরাদিকে গোপন শথ্রুদের পাকড়াও করতে যেয়ে নিরাপরাধ মানুষের ব্যক্তিগত নির্দোষ গোপনীয়তা অধিকার ব্যাপক আগ্রাসনের মুখে দাড়িয়েছে । তার কোন প্রতিকার নেই্ । তবু তাতে যদি সবরকম গুপ্ত হত্যা বন্ধ হয় তাহলে ব্যক্তি মানুষের ক্ষোভ হয়ত কিছুটা প্রশমিত হবে।
যে কোন গোপন হত্যাকান্ডের আগে একাধিক মানুষের যোগসাজসে একটা ষড়যন্ত্র হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। তাছাড়া নারী নিরযাতনের একটা বড় অংশ জুড়েই রয়েছে খুনের ঘটনাকে আত্মহত্যা দেখাবার সাজানো নাটক। খুন করে লটকে দেয়া , লাশের গায়ে দাহ্য ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া খুবই পুরনো কৌশল । এসব ক্ষেত্রে খুনির দোসর থাকা এবং তাদের মধ্যে কোন না কোন পরযায়ে ফোনালাপ হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
মুক্তিযোদ্ধা সন্তান মুনিয়ার লাশ তালা মারা ঘরের ভিতর ঝুলন্ত অবস্থায় মিলেছে। খুন না আত্মহত্যা ,তাই নিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে রহস্য নাটক । লিপি হত্যাকান্ডকেও তেমনি রহস্যের একটি ধূম্রজালে জড়াবার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু খুনের তদন্তে একটা বড় পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি নুসরাত হত্যার দ্রুততম বিচার ও ১০ সহযোগীসহ প্রধান আসামির ফাঁসিদন্ড হওয়ার পর থেকে। পুলিশ মামলা নিয়েছে মুনিয়ার বেলায় যেখানে একজন শীর্ষ ধনী সন্দেহের তীরে বিদ্ধ অবস্থায় সম্পৃক্ত রয়েছে। তার দিকে বল্লম ছোড়া হয়েছে। মিডিয়া মোগল সেই কেউকেটা আসামী কোন প্রভাব খাটিয়েই আগাম জামিন নিতে পারেনি। বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পন করা এখন তারজন্যে বিকল্পহীন হয়ে পড়েছে বললে বোধ হয় ভুল হবেনা।
তালা ভেঙে ধোঁয়ার কুন্ডলি ভেদকরে হতভাগী লিপির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। জ্বলন্ত বিছানার উপর উপুড় হয়ে ছিল নিথর লিপি । তার পিঠে বার বার ছুরিকাঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়ে পুলিশ সেটাকে রহস্যময় খুনের মামলা হিসেবে নথিবদ্ধ করতে কোন ধানাইপানাই করেনি। সেজন্যে সাধুবাদ জানাতে আমি অকুন্ঠ থাকতে চাই।
মামলা মানেই তদন্ত । তার পরে বিচারের এক লম্বা প্রক্রিয়া। জিয়া- শাহ আজীজ জুটর কালো হাতে বানানো ইনডেমনিটিতে আটকে জাতির জনকের নাঙা খুনের হত্যা বিচার হ’ল না টানা ২১ বছর। ৩ নভেম্বর ৭৫ জাতীয় ৪ নেতা খুন হলেন জেলখানায়্।আজও খুনিরা সাজা পেলোনা। ১ জুন ২১ মঞ্জুর হত্যার ৪০ বছর পার হয়েছে। আমাদের এই কলঙ্কিত বিচার সংস্কৃতির পেক্ষাপটে কোন ভিকটিম , বিশেষ করে নিরযাতীত নারী যদি অধৈরয হয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিকার চায়, পাপীকে উচিৎ শিক্ষা দিতে অধীর হয়ে ওঠে তাহলে তার হাতে আর কোন বিকল্প থাকে?
সম্প্রতি এক নারী যে এরই মধ্যে ঢাকায় এক পুরুষকে কেটে ৭ টুকরো করে এক খন্ড এখানে একখন্ড সেখানে ছড়িয়ে দিয়েছে সে কথা একটি দায়িত্বশীল মিডিয়া নিশ্চিত করেছে। সেই রোমহর্ষক ঘটনার বিষয়টা দায়িত্বশীল ডিবি সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কে এই রমনী? কেন সে রণচন্ডালিনী হয়ে চাপাতি হাতে তুলে নিলো? কার বিরুদ্ধে কিসের প্রতিশোধ নিলো? মুনিয়া হেরে গেছে। তার কোন প্রাণের সখী নয়তো? নাকী রাঢ় বাংলার স্বনামধন্য কবি দেব্রত
সিং এর কবিতা থেকে নেমে আসলো চা বাগানের প্রেম প্রবঞ্চনার শিকার মংলি নামের সেই মজলুম নারী। একহাতে টাঙ্গি অন্য হাতে পাপিষ্ঠের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া পিস্তল। চোখে প্রতিশোধের আগুন! কে ? কে এই মঙলি?
চেনেন না? তাকে চিনতে তেমন বেগ পেতে হবে না। ইতিহাসের গভীর অন্তরে হাজার হাজার মঙলি আছে । তাদের আমরা একাত্তরে পেয়েছি।
নিরযাতীত মানুষের নন্দিত কবি রাঢ় বাংলার কৃতি সন্তান ড.দেব্রত সিং এর তুখোড় কলমে গড়া অপরাজিতা মংলি গিয়েছিল তার কালো মুখ লুকাতে নদীর কাছে। নদী বললে , ‘তুই রুইখ্যা দাড়া’।
“ গেলাম নদীর কাছে। নদীকে বললাম, তুমি আমাকে লও। //
…কল কল করে বানের পানি বইছিল…পাহাড় আর নদীর বানের পানি।//
আমি এক গলা জলে গা ডুবাই দিছি। //
নদী বললে, এই মঙলি তুই বলিস কী? /
/মইরে গেলে তো হাইরে গেলি //
…যাহ আজ তোর সব
ময়লা ধুইয়ে দিলাম….
.মাথা উঁচু কইরে উঠ্ । তুই যা রুখ্যা দাড়া মঙলি । তুই রুখ্যা দাড়া।”
কে? কে এই মঙলি? চেনেন তাকে? পরের পর্বে তার সাথে সম্যক পরিচয় ঘটবে আশা করি। সেই পরযন্ত অপেক্ষা।
স্বদেশে এখন হানাদার দখলদার সব থেকে বড় দুর্বৃত্ব কোভিড করোণা। ইতিহাস মানেনা। ভূগোল মানেনা। কাটাতারের বেড়া মানেনা। গরীব ধনী মানেনা। আকাশের মেঘ , নদীর জল, ফাগুনের পবন, বৈশাখের ঝড় , দুর্দম আম্পান, আইলা, ইয়াস যেমন সীমানা প্রাচীর মানেনা করোণাও তেমনি “ডিজাসটার উইদাউট ফ্রন্টিয়ার”। চাঁপাই নওয়াবগঞ্জে সংক্রমনের হার ৭০ %, চিন্তার কারন বইকি! সর্বকালের সর্ববৃহত ২০২১- ২২ দেশ বাজেটের ৭ শতাংশ বরাদ্দ পেতে চলেছে স্বস্থ্য খাত। তা দিয়ে কী ঠেকানো যাবে করোণার অভিঘাত? তবে দুশ্চিন্তার ব্যাপার হ’ল যে গত বাজেটে যা বরাদ্দ ছিল তার মাত্র ৪২/৪৩ শতাংশ খরচ হয়েছে। বাকি টাকা গেলো কোথায়? বেগম পাড়ায় নয়তো?
ইয়াসের ছোবলে ক্ষত বিক্ষত উপকূল বাংলা। বিধ্বস্ত বিপরযস্ত উপকূল বাসী বলছে, ভিক্ষা চাইনা বাবু কুত্তা সামলা। এসব জানতে চোখ রাখুন দেশ এর জন্য লেখা আমার এই এক্সক্লুসিভ উপাখ্যানে।
লেখক: ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ওয়ার কসেপনডেন্ট, বঙ্গবন্ধুর একান্ত সংবাদকর্মী , লেখক কলামিস্ট