শামসুল আরেফিন খান

শামসুল আরেফিন

পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে পৃথিবীর তাবদ সবুজকে কালো আগ্রাসন থেকে বাঁচানো দরকার। সবুজই হ’ল পৃথিবীর প্রাণ। একদা, সবুজ ঘাস, সবুজ ফসল, সবুজ পাতায় ভরা ছিল পৃথিবীর আনাচ কানাচ। লতা গুল্ম বৃক্ষ, সবুজ অরণ্যের প্রবল টানে আকাশ থেকে তখন বাদল নামতো ঝম ঝম করে। আমাদের শিশুরা ছড়া কাটে, “আইকম বাইকম তাড়াড়াড়ি, যদু মাস্টার শ্বশুরবাড়ি, রেন কাম ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম”। আমরাও ছোটবেলায় এই ছড়া কেটেছি। এখন আমার ছোট্ট নাতি আদিত্য “পা পিছলে আলুর দম” বলে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়। আমি বলি,“ বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর”, আদিত্য বলে, “নদে এলো বান”। সেই বানের জলে ভিজে লক্ষ লক্ষ বছর আগেও পরিশ্রমী মানুষের সমতল শষ্যভূমিতে সবুজের বন্যা বয়ে যেত। অনাদরে অয হেলাফেলায়ও তখন শষ্য কনায় ভরপুর হত বিস্তীর্ণ সমতল। অথচ এ সময় বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে অনাবৃষ্টি ও ক্ষরায় যুক্তরাষ্ট্রের শষ্য ভাণ্ডার ক্যালিফোর্নিয়া ফসলের জমি চৌচির হয়ে যায়। সভ্যতার আদি কালে আদিগন্ত বিস্তৃত শষ্যভূমির মালিক ছিল না কেউ। চৌকিদার ছিল না। জমিদার মহাজন ছিল না। কিন্তু একসময় বলবানরা পেশীবলে সেই বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি কব্জা করে ভূস্বামী হ’ল। নৃপতি হয়ে নরাধমে রূপান্তরিত হ’ল। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে অনাবৃষ্টি ও ক্ষরায় নানা দেশের শষ্য ভাণ্ডারে ছুচো কেত্তন করে। তবু নব্য বিশ্ব অধিপতি বলেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন একেবারে বাজে কথা। গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়া বলে কিছু নেই। তালেবানের মৌলবাদী উত্থানকেও এভাবে মিথ্যা বলা হয়। বাংলা ভাই এর উত্থানকে মিডিআর সৃষ্টি এবং হোলি আর্টিজানের নৃশংসতাকে শত্রুতার জের দাবী করা হয়। অথচ মৌলবাদ পুঁজিবাদেরও বড় শত্রু।

সমাজ বিবর্তনের আদিকালের নানা কথা মাথায় রেখেই পুঁজিবাদী ফরাসী দার্শনিক ও সমাজতত্ববীদ জাঁ জ্যাক রুশো বললেন, “জন্মগতভাবে মানুষ স্বাধীন ছিল। মানুষই মানুষের পায়ে শিকল পড়িয়েছে। সমাজব্যবস্থা মানুষকে মানুষের গোলাম বানিয়েছে। মানুষ মানুষের প্রভু হয়েছে। মানুষ মানুষের ক্রীতদাশ হয়েছে”। যে নারী ছিল আজন্ম অরন্যের নরপতি, সেই নারী বন্দী হ’ল পুরুষের প্রাসাদের অন্তঃপুরে। সন্তান প্রসবিনী নারী শৃঙ্খলিত হ’ল সম্পদের মালিকানার উত্তরাধিকার নির্ভেজাল ও নিরঙ্কুশ করতে। রুশোই বললেন,“ আগে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে স্বাধীন ছিল। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানার ধারণা সৃষ্টি হওয়ায় সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। তার ফলে প্রতারণা ও অতৃপ্ত বাসনা মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। তাই মানুষের অধিকার রয়েছে বিপ্লেবের দ্বারা রাজতন্ত্রের পতন ঘটাবার”। মহান দার্শনিক রুশোকে ফরাসী বিপ্লেবের মূল কারিগর মনে করা হয়। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে ফরাসী মননে বিপ্লবের অগ্নি স্ফুলিঙ্গ জাগ্রত করতে সক্ষম হন। ৫ মে ১৭৮৯ থেকে৯ নভেম্বর ১৭৯৯, ফরাসী বিপ্লব হ’ল । তারই মধ্যে ১১ আগস্ট ১৭৯৮ সামন্তবাদ বিলুপ্ত করা হ’ল। পুঁজিবাদী দার্শনিক রুশো বিপ্লবের মন্ত্র দিলেন। কিন্তু বিপ্লব রক্ষার কোন তত্ব দিলেন না। ফরাসী বিপ্লব তাই দম হারিয়ে ফেলে বিশ্বজয়ী নেপোলিয়ানের অশ্ব দাবড়ানোর চাবুকে পরিণত হ’ল। পরবর্তী শতাব্দিতে জার্মান দার্শনিক মার্ক্স ও এঙ্গেলস সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ব দিলেন। কিন্তু তাঁরাও বিপ্লব সংরক্ষণের মূলমন্ত্র দিলেন না। তার ফলে সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব পার্টির একনায়কত্বে পরিণত হ’ল। পার্টির একনায়কত্ব কতিপয় নেতার একনায়ত্ব থেকে এক ব্যক্তির একনায়কত্বে পর্যবসিত হ’ল। POWER CORRUPTS -ABSOLUTE POWER CORRUPTS ABSOLUTELY কথাটা ছিল নেহায়েত তত্ব। কিন্তু সেটা নিরেট বাস্তবে নেমে এসে সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে গিলে খেলো। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের প্রয়াণ হল ৯০ সালে গরভাচেভ- রিগানের প্রেমালিঙ্গনে। পেরেসট্রয়কা গ্লাসনস্ট ইতিহাসের শিক্ষার একটা বড় আধার।

১৮৪৬ সালে মার্কস-এঙ্গেলস লিখেছিলেন, ‘পুঁজিবাদ ও সমাজবাদ, দুটোই বিশ্বব্যবস্থা পুঁজিবাদ যতদিন বহাল থাকবে বিশ্ব ব্যবস্থা হিসেবে, ততোদিন ‘কম্যুনিজম’ তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারবে না। কিন্তু তাঁরা স্থানীয়ভাবে এলাকা ভিত্তিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নাকচ করেননি। সেই যুক্তিতেই পৃথিবীর একাংশে এবং কোন কোন অংশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তাবত মানুষের বিবেক ছুতে।

একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে সামন্তবাদী যুগে মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করেছে। “শিয়ালের গা ঢাকা দেয়ার জন্যে গর্ত ছিল, পাখির ক‚জনের জন্য ছিল নীড়, শ্বাপদেরও নিরাপদ ঠাঁই ছিল অন্তহীন অরণ্যে। কিন্তু মানুষের মাথা গোজার ঠাই ছিল না।” তখন হিমালয় বা আল্পস পর্বত শীর্ষে বরফ গলেনি। মেরুদেশে তুষার গলেনি। সাগর উথাল পাথাল হলেও পানির উচ্চতা বেড়ে বিশ্বময় মানুষের ঘরবাড়ি গ্রাস করেনি। কারণ তখন পন্য উৎপাদনের যান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল না। চিমনি ছিলনা। কালো ধোঁয়ার লাগামহীন উদগীরণ ছিল না। কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অপরিণামদর্শী আয়োজনও ছিল না। পিকিং, লন্ডন, রোম, সিডনি, বার্লিন নিউইয়র্কে ও দিল্লী এবং ঢাকায় লক্ষ লক্ষ গাড়ি থেকে কালো ধোঁযা নির্গত হ’ত না। বুড়িগঙ্গার ছিল ভরা যৌবন। শীতলক্ষা ছিল অকলঙ্কিত নিষ্কলুষ জলাধারা। বাঁশ ছিল না তাই বাঁশিও ছিল না। কারখানা ছিল না। তাই কারখানার দূষিত বর্জ আবর্জনাও ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ছিল ক্রীতদাশ কর্ষিত আদিগন্ত ফসলের ক্ষেত। রাশিয়ায় ছিল বিস্তীর্ণ শষ্যভূমি। রাশিয়ায় একদা যিনি ভূস্মামী ছিলেন, কাউন্ট নিকোলাই ইলিচ তলস্তয়ের পুত্র, সেই অভিজাত লেভ নিকোলাইভিচ তলস্তয় একদিন সৈনিক থেকে মহান লেখক হয়ে উঠলেন। তিনি সেই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতেন যা মানুষকে ভিতর থেকে বদলে দেবে। তিনি দেখলেন মানুষ উদয়াস্ত ছুটছে সম্পদের অধিকার বিস্তীর্ণ থেকে বিস্তীর্ণতর করতে। কিন্তু দিবা শেষে একদিন সে মাত্র সাড়ে তিন হাত ভূমিতে শেষ শয্যা রচনা করছে। তিনি লিখলেন, হে মানুষ অন্তিম শয়নের জন্যে সাড়ে তিন হাতের বেশি তোমার আর কত জমি দরকার? একথা ঠিক যে তাঁর সেই অমিয়বানী তাবদ মানুষের বিবেক ছটুতে পারেনি। কিন্তু বিবেকবান মানুষের নরম মনে রেখাপাত করেছিল। পার্ল এস বাক চীনের লাখো বছরের সামন্তবাদের অন্তিম সময়ের নিপুন ছবি এঁকে নোবেল পেয়েছেন। তার গুড আর্থ গ্রন্থের নায়িকা চাষী ওয়াঙ লাঙের স্ত্রী ওলান আজীবন সামন্তবাদের কাঁদাজলে হাবুডুবু খেয়ে যখন পুঁজিবাদের ঝড়ে সামন্তবাদের বিরাণ প্রাসাদে সুখের শয্যা পাতলেন তখনও সন্ধ্যায় ঝিঁঝিঁ পোকার গান শুনলেন। জীবন শুরুর সাঁঝের মত। সুখের সোনার হরিণ মায়া মরিচীকা হয়ে রইলো। বসন্ত তখন তাঁর জীবনের এক বিস্মৃত অতীত। স্থায়ী শীতের ঘোরে জীবন তার কাছে স্বাদ গন্ধহীন। বুঝলেন না জানলেন না পৃথিবীর কোন পরিবর্তন তাকে ভাসিযে নিয়ে গেলো। পরিবর্তনটা সবাই বুঝতে পারে না।

আমেরিকান লেখিকা পার্ল এস. বাক এর অমূল্য সৃজন “দি গুড আর্থ” কে চিরায়ত গ্রন্থ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কেননা এই লেখাটি কালের গন্ডি পেরিয়ে মহাকালের গন্ডিতে প্রবেশ করেছে। ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে চীনের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসটির কেন্দ্রে রয়েছেন ওয়াঙ লাঙ নামের একজন দরিদ্র্য চাষী এবং তার মাঠকর্মী জীবনসাথী ওলান। প্রকৃতির বৈরিতার সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি যেন তারা। অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ কিংবা অতিবৃষ্টি-এসবই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তারই অনুষঙ্গ জীবনের ছন্দ-পতন। প্রাকৃতিক কারণেই প্রকট হয়ে উঠেছে জমিদারি প্রথা, কৃতদাস প্রথা, শ্রেণি বৈষম্য। নিরলস পরিশ্রমের ফল এবং বদলে যাওয়া সময়ের আনুকুলে এ ওয়াঙ লাঙ একজন সাধারণ কৃষক থেকে হয়ে ওঠলেন সুখের সওদাগর। আর তার এই উত্থানের সাথে সাথে বদলে গেলো তার জীবন ধারা। শ্রীহীন বর্ষীয়ান ওলান হয়ে গেলেন অপাঙতেয়। তার শীতার্ত শ্রান্ত শীর্ণ অস্তিত্ব সক্ষম ওলানকে আর কাছে টানতে পরেলো না। রপসী লোটাসের উষ্ণ শয্যা তাকে বন্দী করে লাখলো। জীবন সংগ্রামে সমান অংশ নিয়ে ছিলেন ওলান। বস্তুতঃ তার অক্লান্ত কঠোর শ্রমই ওয়াঙ লাঙ কে সব ঝড় ঝাঁপটায় টিকিয়ে রেখেছিল। ওয়াংকে একজন সাধারণ চাষি থেকে তুলে এনে ধনাঢ্য ব্যক্তিতে রূপান্তরিত করেছিল। কিন্তু ধনী ওয়াঙ লাঙ এর জীবনে বিগত যৌবনা মৃত্যূ পথযাত্রী ওলানের অর কোন প্রয়োজন রইলোনা। “ যে সমাজ একজন নারীকে কেবলই গৃহস্থলীর কাজ আর সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র মনে করে, যে সমাজে নারী গৃহপালিত পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট, সেই সমাজে ওলান এমন এক নারীর মূর্ত প্রতিচ্ছবি যে কিনা স্বল্পবাক কিন্তু তার স্বপ্ন সীমাহীন”। অদৃষ্টের পরিহাস। জীবন সায়াহ্নে ইতিহাসের ঝড়ে তার সে স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়ে।

রাষ্ট্র তুমি কার?

“ফুলবাড়িয়া কাঁদেরে /লাশ নিয়ে কাঁধেরে/ আর হাসপাতাল আছে শুয়ে/ রবে না তারা নুয়ে/ শ’খানেক লোক।..ফুলবাড়ির লোকেরা নয় যেন মানুষ ! তাই বিডিআরে করে গুলি ‘ঠুশ ঠাশ ঠুশ ঠাসঠুস !’ একজন অখ্যাত কবির দুর্বল এই গণ কবিতাটা ২৬ আগস্ট, ২০০৬ এ ফুলবাড়ি আন্দোলনে গুলি চালানোর রাতে লেখা। ঐদিন চারদলীয় জোট সরকার গুলি চালায়। এশিয়া এনার্জির সাথে সরকারের আঁতাতের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করছিল তাদের উপর গুলি চালানো হয়। আল-আমিন, সালেকিন ও তরিকুল নিহত হয়। গুলবিদ্ধ হয় কুঁড়িজন, আর প্রায় লাঠির প্রহারে দু’শ লোক আহত হয়। রক্তাক্ত আন্দোলনের মুখে চারদলীয় জোট সরকার আপাতভাবে পিছু হটতে বাধ্য হয়। সারের দাবি জানাতে এসে ১৮ কৃষক গুলি খেয়ে লাশে পরিণত হয়। রাজাকার মন্ত্রীরা ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা পতাকা উড়িয়ে হিন্দু দমন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনাশের লক্ষ্যে “রাজাকার রাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়। জঙ্গী শক্তি লালনকরেও ভারতের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে প্রমাণ করে দেয় যে, রাষ্ট্র যখন যার দখলে থাকে তখন তারই সেবাদাসে পরিণত হয়। দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। জামাত-বিএনপির হাতে পড়ে একাত্তরে উৎপন্ন ধর্ম নিরপেক্ষ বাঙালি রাষ্ট্রটাই বাঙালি দমনের যন্ত্রে পরিণত হ’ল। কৃষক দমনের হাতিয়ার হ’ল। শ্রমিক দলনের হাতিয়ার হ’ল। নারী নিপীড়ন, নারী উচ্ছোষণকে ধর্মের অনুষঙ্গ করে নিলো।

পরিবর্তন আসে ইতিহাসের ঝড়ে বিবর্তনের অবিরাম গতিধারায়। সে ঝড়ে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান। মিশরের ফেরাউন, চীনের মিং সম্রাট, ভারতের শাহজাহান কিছু বুঝতে পারে না। কিন্তু ‘হীরা মুক্তা মানিক্যের ঘটা, ইন্দ্রজাল ইন্দ্র ধনুচ্ছটা’, সবই অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। মিশরের পিরামিড দেখিনি। কিন্তু চীনের ভূগর্ভে নিমজ্জিত তিন তালা রাজপ্রাসাদ দেখেছি। সেখানে মিঙ রাজা-রানী এবং তাদের দাশ দাশীদের কঙ্কাল সব শ্রেণি বৈষম্য ও ধনী দরিদ্র ভেদাভেদ হারিয়ে ফেলেছে। যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় তাদের সংখ্যা খুবই নগন্য। কিন্তু তারাই দ্রুত বিকাশমান সভ্যতার চালিকা শক্তি। তারা ইতিহাসের নতুন আত্মজকে শুধু প্রসবিত হতেই দেখেন না। তারা ইতিহাসের প্রসব যন্ত্রণাও শুনতে পান। মাটিতে কান পেতে শুনতে পান ধাবমান অশ্বের পদধ্বনি। যারা অন্ধ বধির ও অবচেতনার জগদ্দল পাথর, তারা হাজার বছরে কোনদিনও ইতিহাসের কান্না শুনতে পাননি। ইতিাসের কন্ঠস্বর শুনতে পাননি। ইতিহাসের গর্জনও শুনতে পাননি। আইয়ুব যুগের বটতলার উকিল মোনায়েম খান এবং এ যুগের সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নাল আবেদিনের খোড়া যুক্তির ভিতর তাই কোন প্রভেদ দেখলাম না। আইয়ুব খান বলতে দুজনই অজ্ঞান।

রাষ্ট্র মাত্রই দমনের যন্ত্র

ÒSTATE IS THE ORGAN OF SUPPRESSIONÓ কথাটা মার্ক্সবাদীদের। “রাষ্ট্র মাত্রই দমনের যন্ত্র”। কথাটায় দম আছে। ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই এবং রাশিয়ার জার নিকোলাসের সামন্তবাদী রাষ্ট্র নির্মমভাবে দমন করতো ভূমিহীন দরিদ্র প্রজাদের। ফরাসী বিপ্লবী ম্যাক্সিমিলিয়ান জ্যাকোবিন গং এবং রুশ বিপ্লবী লেনিন স্তালিন মেহনতি মানুষের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন। তাদের রাষ্ট্র শোষক শ্রেণিকে দমন করার প্রয়াস পেলো। প্রথমটা ১ বছর টিকলো। ২য় টা ৭৩ বছর। সোভিয়েত সমাজতন্ত্র সাম্যবাদ অব্দি পৌঁছাতে পারেনি। কিন্তু মানুষের ৫ মৌলিক চাহিদা-অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং কর্মসংস্থান,-পূরণ করার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে সার্বজনীন রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণাকেও বিশ্বব্যবস্থায় ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে। ইউরোপ আমেরিকা কানাডা অস্ট্রেলিয়া সবই বলতে গেলে এখন কল্যাণ রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্তগলো পূরণ করছে।

আমার মনে হয় পুঁজিবাদ বেঁচে আছে সমাজতন্ত্রের অন্তস্বারকে অবলম্বন করে। সমাজতন্ত্রের মানবতাকে আঁকড়ে ধরে। সমাজতন্ত্রের ভালোবাসাকে আত্মস্ত করে। পুঁজিবাদ কৃষক শ্রমিকের কোমর থেকে দাসত্বের শিকল খুলে দিয়েছে। অন্তঃপুরবাসী সন্তান প্রসবিনী অসূর্য কম্পষ্যা নারীকে নিজের ভালোবাসার মানুষ নিয়ে ঘর করার স্বাধীনতা দিয়েছে। শিশু ও বৃদ্ধের জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা পুঁজিবাদের ধর্মে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাদের দাসত্ব এখন আর লোহার শিকলে বাঁধা নেই। ঋণা বদ্ধ নিশ্চিন্ত জীবন ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার বন্ধনে এক অভিনবদাসত্বে রূপান্তরিত হয়েছে। এ সবই সমাজতন্ত্রের দান। পুঁজিবাদের ভিতরটা খানিক বদলে দিয়ে সমাজতন্ত্র রিট্রিট করেছে, ইতিহাসের কোন মহেন্দ্রক্ষণে বিশ্ব ব্যবস্থা হিসেবে ফিরে আসবে বলে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২১১ নম্বরে ফোন করলে খাদ্য-বস্ত্র ছুটে আসে অসহায় মানুষের কাছে। মাথা গোঁজার ব্যবস্থাও মেলে ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। দৃশ্যমান হোমলেসদের গল্পের ভিতর রয়েছে আবার অন্য গল্প। ৯১১ তে ফোন করে আমি ১৯১০ সালে ১০ মিনিটের মধ্যে মিনি হাসপাতাল সজ্জিত এমবুলেন্স চড়ে ভার্জিনিয়ায় রেস্টন হাসপাতালের অপেক্ষমান ডাক্তারসহ ইনটেনসিভ কেয়ার ব্যবস্থায় নিবিড় সেবা পেলাম। তিনদিন ধরে ১৪ ডাক্তারের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা ও গভীর অনুসন্ধানে আমার রোগ ধরা পড়লো। ভার্টিগো, মানে মাথা ঘোরা। চোখের ছানি অপসারণ ও কৃত্রিম মনি সংস্থাপনের একটা পার্শ প্রতিক্রিয়া। ১০০ বছর সংগ্রাম করে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টি সার্বিক স্বাস্থ্য সেবার এক সুলভ সম্ভার দরিদ্র্য মানুষের দোর গোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। রিপাবলিকানরা ক্ষমতায় এসেই তার নিকুচি করে রক্তাক্ত করে ফেলে। ক্ষমতার ভারসাম্যের কল্যাণে অবশ্য ব্যবস্থাটা টিকে যায়।

আমার স্মৃতি কথা বলে না। আমি ১৯৬১ সালের ১ ডিসেম্বর, এপেÐিসাইটিসের প্রচÐ ব্যাথা নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে গেলাম। ভোর ৪টা থেকে ৮ টা অব্দি নানা জনের হাতে ‘পেট টেপাটিপি’ ছাড়া কোন স্বাস্থ্যসেবা পেলাম না। ভাগ্যক্রমে, ৮টা সাড়ে আটটার দিকে আমার স্কুলের সহপাঠী, তখন ৩য় বর্ষের ছাত্র, ফজলে রহিম (অধুনা ডা. ব্রিগেডিয়ার-অবঃ) এমারজেন্সির দরজার কাছে এসে আমার চেচামেচি শুনে জোরেশোরে জিজ্ঞেস করলো, কী ব্যাপার? একজন এপ্রোণধারী পেট টেপা লোক তেমনি জোর গলায় বললে, “আরে একটা চিড়িয়া”। আমার বন্ধু কাছে এসে বললে, আরে তুই ? আমি তখন দৈনিক সংবাদে কাজ করি। আমার বন্ধু তার সহকর্মীকে বললে, “ইনি আমার বন্ধু শুধু না, ইনি একজন জাঁদরেল সাংবাদিক বটে। তার এই দুরাবস্থার জন্যে আমাদের হেনস্থা হতে পারে”। রেসটন হাসপাতালের দুগ্ধ ফেনিভ শুভ্র শয্যায় শুয়ে সেই স্মৃতি রোমন্থন করছিলাম। ২০০০ সালে বুকের ব্যাথা নিয়ে গেলাম ঢাকার হৃদরোগ হাসপাতালে। ভর্তির পর অনেক কাকুতি মিনতি করেও সাধারণ বেডের বেশি কিছু জুটলো না। আমার পরম শুভাকাঙ্খী লেখিকা আফরোজা পারভীন (যুগ্ম সচিব- অবঃ) তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহকারি সচিব। খবর পেয়ে তিনচারজন সহকর্মীকে নিয়ে ছুটে আসলো। সবাই তারা আমাকে লেখক- সাংবাদিক বলে চেনে। আমি তাৎক্ষণিকভাবেই একটা সিঙ্গেল কেবিন পেয়ে গেলাম। একমাস ছিলাম। সেকথা আমি ভুলিনি। সেদিন আমি পাওয়া-না পাওয়ার ব্যাপারটা তেমন গভীরভাবে বুঝিনি। কিন্তু এখন স্বদেশে সেই হাসপাতালেরই তলার দিকের একজন খুবই নগণ্য কর্মচারির কাছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা মজুদ আছে শুনে ব্যাপারটা সম্যক বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না।

স্বাস্থ্য সেবা খাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশে একটা ব্যাপারে মিল দেখতে পাচ্ছি। যেমন ধরুন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৯৬-২০০১ মেয়াদে হাজার হাজার কম্যুনিটি ক্লিনিক বানিয়ে দরিদ্র পল্লীবাসীর দোর গোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দেয়ার উদার ব্যবস্থা নিলেন। রিপাবলিকানদের মত জামায়াত-বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে সিংহাসনে বসে সেগুলোর দরজায় তালা লাগিয়ে দিলেন। বড় বড় ডাক্তারদের গ্রাম-দর্শন বন্ধ হ’ল। এরকম আরও অনেক মিল অমিলের ব্যাপার আছে। যা বলতে গেলে পরিসরে মহাভারত হবে।

সব রাষ্ট্রই যে কারও না কারও দমন ও দলনের হাতিয়ার সে কথা আমি বিশ্বাস করি। ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র দমন করে ৯০ ভাগ শোষিত মানুষকে। কারণ তারা নিশ্চিদ্রভাবে ঐক্যবদ্ধ গগন বিদারি গর্জন করায় ফ্রান্সের শোষক রাজার বাস্তিল দুর্গ ধ্বসে পড়েছিলো। সেন্ট পিটার্সবার্গের শীতকালীন প্রাসাদের সেলারে রক্ষিত বিশ্ব সেরা সুরার ভাণ্ডার তাদের তাণ্ডবে বিদীর্ণ হ’ল। মদের বন্যায় শহর ভেসে গেলো। আজীবন তৃষ্ণার্ত আম জনতা সেই অমৃত পান করে রাজতন্ত্রকে ঝেটিয়ে বিদায় করলো ইতিহাস থেকে। এই অভিজ্ঞতা ধারণ করেই পুঁজিবাদী গণতন্ত্র বিশ্ব ব্যবস্থায় বহাল হয়েছে।

কাজে কাজেই ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র দলন করবে ৯০ ভাগ শোষিত মানুষকে। তাতে আর গলদ কোথায়? শোষিত মানুষের আছে সংখ্যায় বড় জনবল। আমরা দেখলাম ১৯৬৯ সালে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী সেই জনবল নিয়ে সন্তান প্রতীম শিষ্য আসাদের রক্তে ভাসিয়ে দিলেন আইয়ুবের তখতে তাউস। জেলের তালা ভাঙলো জনগণ। জনতার মুজিব বেরিয়ে এলেন। গণমানুষের চোখের মনি শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু উপাধি পেয়ে নবরূপে উদ্ভাসিত হলেন।

 একইভাবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র দমন করবে শোষকদের। যাদের সংখ্যা কোন জনগোষ্ঠীর ১০ ভাগের অতিরিক্ত না। তাদের আছে অর্থবল। আছে পেশীবল। ভাড়াটে লোকবল আছে। উজির নাজির মন্ত্রী শান্ত্রী, কামান বিমান আছে। রাজাকার, আল বদর আল শামস্ আছে। অধুনা তালেবান, আইএস, আলশাবাব সংযুক্ত হয়েছে তাদের শক্তির বহরে। আছে কতোনা তল্পীবাহক, লাঠিয়াল, চামচা, স্তাবক ও পদলেহী সুবিধাবাদী আইনের অধ্যাপক, বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষক, উকিল ব্যারিস্টার। সপ্তম নৌবহরও তাদের গোলাম। স্তালিন, মাও সেতুং, টিটো, ক্যাস্ট্রো স্বদেশে তাদের কঠোরভাবে দমন করেছিলেন বলেই বিপ্লবকে বাঁচাতে পেরেছিলেন। কিন্তু যাঁরা বিপ্লবের তত্ব দিয়েছিলেন তাঁরা বিপ্লবকে রক্ষা করার কোন তত্ব দেননি। সে তত্ব বা পন্থা সংশ্লিষ্টদের নিজ বাস্তবতায় উদ্ভাবন করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই সে তত্ব প্রয়োগে ভুল হয়েছে। সিআইএ এখন বলছে, রাশিয়া ও চীনে প্রতিবিপ্লব দমন করতে “হলোকাস্টের” সমান লোকক্ষয় হয়েছে। তারা অবশ্য এও স্বীকার করছে যে, ইন্দোনেশিয়ায় সমাজতান্ত্র দমন করতে যে লোকক্ষয় হয়েছে তাও হলোকাস্টের সমান। জার্মানিতে ইহুদি নিধনকেই বলা হয় ‘হলোকাস্ট’। কম করে ৬০ লক্ষ মানুষের নির্মম হত্যাকাণ্ড।

শামসুল আরেফিন খান

কলাম লেখক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *