মোস্তাক আহমেদ
দিপীকা আমার বান্ধবী। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম যেদিন ওর সাথে পরিচয় হয় সেই থেকে অদ্যাবধি সম্পর্ক হিমালয় শৃঙ্গে আরোহনের উচ্ছাসের মতো কেবল উপরেই দিকেই ধাবমান। এক পা উঠি ত, আরেক পা সামনে এগুনোর উচ্ছ্বাসে মেতে থাকি সবসময়। ওর সাথে আমার ভাবের ও ভাবনার, চিন্তা ও মননের সাংঘাতিক মিল। দহরম মহরম সম্পর্ক। আমরা যে একটা বিপরীত মেরুর দুই জাত এটা ঘুণাক্ষরেও কখনো অনুভব করিনি। দিপীকার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী শ্রেয়া। কোন একটা অনুষ্ঠানে আমার প্রথম পরিচয়। অত্যন্ত সদালাপী ও বন্ধুবৎসল। এক লহমায় আপন করে নেয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা মেয়েটির। আমিও প্রাণ খুলে ওর সাথে মিশি, খাওয়াদাওয়া করি, গল্পগুজব করি- সেই সাথে ছবি তোলাতোলি সব। শ্রেয়া তার ফেইসবুক প্রোফাইলে ছবিগুলো পোস্টও করে। ছবির একটা সুন্দর ক্যাপশন দিয়েছিল সে। সেখানে আমার খানিক গুণকীর্তন ছিল। গল্পের প্রারম্ভিকতা এভাবেই।
দিপীকার ফোন। ‘তোমার সাথে আমার প্রিয় বান্ধবী শ্রেয়াকে দেখলাম।’
‘ও কী তোমার বান্ধবী? গতকাল একটা অনুষ্ঠানে দেখা। অসম্ভব ভাল মেয়ে মনে হলো।’
‘মনে হলোনা, আসলেই ভাল মেয়ে। আমার ইউনিভার্সিটির হলের রুমমেট। আমার অন্যতম সেরা বান্ধবী। সর্বগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। আমার আত্মার আত্নীয়।’
‘বুঝলাম, আমার সেরূপই মনে হয়েছিল বলেই আমিও প্রানখুলে ওর সাথে মিশেছিলাম।’
তখন থেকেই শ্রেয়াকেও আমি দিপীকার কাতারে নিয়ে যাই। আমি তাকে আমার ফ্রেন্ডলিস্টে এড করে নিই। নানা সময়ে ও আমার লেখায় কমেন্ট করে। আমিও প্রত্যুত্তর দিই। একটা সৌহার্দ্য সম্পর্ক গড়ে উঠে।
শ্রেয়ার সাথে আমার সামনাসামনি দেখা কেবল একদিনের। প্রথম সাক্ষাতের পর দীর্ঘকাল ইতোমধ্যে অতিবাহিত হয়েছে। আমি আমার স্মৃতি বিভ্রাটে ওকে আবিষ্কার করা শুরু শ্রাবন্তির নামে আরেক বান্ধবীর সাথে। যেন শ্রাবন্তিই শ্রেয়া। ফেইসবুকে ছবির অস্পষ্টতা আমাকে ধাঁধায় ফেলে দেয়। আমি তারপর হতে শ্রেয়ার জায়গায় শ্রাবন্তির সাথে ভার্চুয়াল সম্পর্ক রাখি।
একদিন আচমকা শ্রাবন্তিকে একটা কমেন্ট করলাম। আমি শ্রেয়া মনে করে তার বৈশিষ্ট্য যথাসম্ভব তুলে ধরেছিলাম সে কমেন্টে। শ্রাবন্তিও উপযুক্ত জবাব দিল। আমার কেন যেন মনে হলো, ওকে ফোন করে বলি, ‘তোমাকে যে কমেন্ট করেছি তার কোনটাই বাড়াবাড়ি করে লেখা নয়। তোমরা হয়তো মনে কর, কবিরা সব আবেগ থেকে লেখে, ওখানে সত্যের বালাই নেই। তা একদম ঠিক নয়। আবেগ ছাড়া সৃষ্টি অসম্ভব। যখনই দেখবে তোমার মধ্যে আবেগ নেই, ভাবনার জগৎ খালি হয়ে গেছে- তখন বুঝতে হবে তুমি জীবন্মৃত।’
‘শ্রাবন্তি আমার কথায় একমত পোষণ করে। বলে, ‘কবি কেবল একজন কলাবিদ নয়, সে একজন বিজ্ঞানী ও গবেষকও।’
আমি শ্রাবন্তির কথায় সহমত পোষণ করে বলি, ‘তুমি তো সত্যিকার কবি দেখছি।’
শ্রাবন্তির মেয়ে অরণি আমার স্বরচিত কবিতা যেভাবে আবৃত্তি করে শুনিয়েছিল এখনো আমার কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হয়। বললাম, ‘তোমার মেয়ে কেমন আছে?’
‘স্যরি বন্ধু, আমি স্টিল নাও ব্যাচেলর। তবে কোথাও গেলে আমার ভাইপো, ভাইঝিদের সাথে নিয়ে যাই।’
আমার কেন যেন সন্দেহ জাগলো। আমি কী ভুল কাউকে ফোন দিয়েছি। দিপীকা যেভাবে বলেছিল, তাতে বৈধব্যের কোনকিছু ছিলনা। তাছাড়া এরূপ গুণবতী একজন নারী অবিবাহিত থাকতে পারে তাও কল্পনার অতীত।
আমি আরেকটু ভেরিফাই করতে করতে বললাম, ‘তোমার বাসা কী উত্তরায়?’
বললো, ‘না। আমি ধানমন্ডি থাকি- বড় ভাইয়ের সাথে।’
এবার আমি নিশ্চিত হলাম। যে গতি নিয়ে শুরু করেছিলাম, মুহূর্তে তাতে ভাঁটা পড়লো। ওপাশ থেকে কথার ফল্গুধারা প্রবাহিত থাকলেও আমি স্তিমিত স্বরে বললাম, ‘আজ তাহলে রাখি?’ এই ছিল শ্রাবন্তির সাথে আমার শেষ কথা। দিপীকাকে একথা বলবো বলবো বলে আর বলা হলোনা।
লেখক: কবি, গল্পকার ও সচিব বিসিক