শাহরিয়ার সোহেল
মেয়েটি বেশ আকর্ষণীয়। সুন্দর বলা চলে। হাসলে গালে টোল পড়ে। উচ্চতা পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি । বাঙালি মেয়ে হিসেবে যথেষ্ট। চোখে কাজল দিলে আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। স্লিম ফিগার। বোম্বের নায়িকাদের মতো। গায়ের রঙ কাঁচা হলুদের মতো ফর্সা। এক কথায় যে কোন পুরুষকে আকর্ষণ করার সহজাত ক্ষমতা রয়েছে তার মধ্যে। মেয়েটির নাম সুলতানা। মেয়েটির শারীরিক সৌন্দর্য্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মনের সৌন্দর্য্য। বাড়ির শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর-ননদ, চাকরীক্ষেত্রে সহকর্মীদের প্রতি রয়েছে তার উদার মন। সকলকেই সে খুব ভালবাসে। বাড়ি ভাল কিছু রান্না করলে সহকর্মীদের জন্য নিয়ে আসেন। দেবর-ননদদের ছেলে-মেয়েদের প্রতি উৎসবে সামর্থ্য অনুযায়ী জামা-কাপড়, প্রয়োজনীয় জিনিষ দেন। সবার সাথে ভালভাবে নিজেকে মানিয়ে নেন। সব সময় হাসি-হাসি মুখ নিয়ে কথা বলেন।
তার মনের সৌন্দর্য্যে হারিয়ে যায় সবাই। এমন কি অনেকক্ষেত্রে অচেনা ব্যক্তিরাও। একবার এক ব্যাংক থেকে লোন তুলতে গেছেন, ব্যাংকের ম্যানেজারের সাথে প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা হয়েছে। ব্যাংক ম্যানেজার ঠিক মনে রেখেছে তার কথা। একদিন গাড়ি হাঁকিয়ে চলে এসেছেন বাড়িতে। তিনি যথারীতি নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন অতিথিকে। ম্যানেজার বললেন, “চলুন, আপনাকে নিয়ে ল্যং ড্রাইভে যাই।’ ভারি মুশকিলের কথা। সুলতানা নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “আচ্ছা, আরেকদিন দেখা যাবে।” তিনি ‘শাইনিং লাইফ’ নামক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। খুলনা সদরে ছিল তার পোস্টিং। ঐ প্রতিষ্ঠান প্রধানের দুইজন স্ত্রী ছিল। তথাপি তিনি একদিন সুলতানাকে বললেন, “চলো, বিয়ে করে ফেলি।” সুলতানাতো রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেন। এরপর থেকে সে নানা রকম পাগলামি করতে থাকে। কাজে মনোযোগ থাকে না। প্রতিষ্ঠান প্রধানের এ রকম করলেতো চলে না। অনুরোধ উপেক্ষিত হওয়ায় তিনি ছোট মানুষের মতো কাঁদতে লাগলেন। সুলতানাকে দেখলেই তিনি হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠেন। বলেন, ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না। আমাকে বাঁচাও, প্লিজ।’ অনেক কষ্টে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শাখা-ঢাকা থেকে তিনি বদলীর আদেশ সংগ্রহ করেন। চলে আসেন যশোরে। একবার তার প্রতিষ্ঠানের কাছেই সেনাবাহিনীর একটি ছোট দলের শীতকালিন ট্রেনিং পড়ে। সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ নেবার জন্য তার প্রতিষ্ঠানে যায়। সুলতানা বিদ্যুৎ নিতে সহায়তা করে। উক্ত দলের যে কমান্ডার থাকে, সে প্রতিদিন তাকে ফোন করে। সে বলে, ‘ওহ! আপনি কী সুন্দর, ঘুমের ভেতরও আপনার স্বপ্ন দেখছি, আবার দিবা স্বপ্নও দেখছি। আপনি খুব ভাল। আপনার সাথে গল্প করতে খুব ভাল লাগে। সাত দিনের ট্রেনিং এর জন্য তারা এসেছিল। প্রতিদিন সুলতানার জন্য কমান্ডার নানা প্রকার খাবার পাঠাত। এও এক বিভ্রাট। সুলতানার অন্য সহকর্মীরা বলত, ‘কী ব্যাপার!’ সুলতানা বেশ অস্বস্তিতে ভোগে। সুলতানার প্রতিষ্ঠানের পাশে আর একটি বেসরকারী সংস্থা রয়েছে। মাঝে মাঝে এ ধরণের প্রতিষ্ঠানের ভেতর আন্ত:সভার আয়োজন হয়। উক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধান একদিন সুলতানাকে ডেকে বলল, ‘আপনার জন্য আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। রাতে ঘুমাতে পারছি না। দিনে স্বস্তি পাচ্ছি না। আপনি যদি আমাকে বিয়ে করতে রাজী হন, তবে আপনাকে নিয়ে বিদেশে চলে যাব। আমার টাকার অভাব নেই।’ চার সন্তানের জনক যদি এমন প্রস্তাব দিয়ে ফেলে, সেটি খুব অস্বস্তিকর ব্যাপার।
এ রকম বহু বিভ্রাট সুলতানাকে সহ্য করতে হয়েছে। তার শরীরের সৌন্দর্য্য আকর্ষণীয়, মনের সৌন্দর্য্য আরও বেশী চিত্তাকর্ষক, সব কিছু মিলিয়ে সে যেমন সুন্দর, তার ভাগ্যটা তেমনই বিভ্রাটজনক। ভাগ্য বার বার তাকে বিপর্যস্ত করেছে। ভাগ্যের হাতে নির্যাতিত হতে হতে সে এক অসহায় ক্ষুদ্র প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। সে যখন অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্রী, তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলেন এস. এস. সি.তে পড়া এক মোটা কালো ছাত্রীকে। সবার চোখে সে আকর্ষণহীন, বিরক্তিকর; চেহারা মোটেই ভাল নয়; অথচ তার বাবা যে ঐ কালো মোটকা ভোম্বলের ভেতর কী সুখ পেল, তা তিনিই জানেন। তার বাবা সেনা বাহিনীতে চাকরী করতেন। তারা সে সময় থাকতেন বাগেরহাটে। দ্বিতীয় বিয়ের পর বাবা ছোট স্ত্রীকে নিয়ে চলে গেলেন বরিশাল। পরবর্তী জীবন তাদের সেখানেই কাটে। মা ও চার ভাই-বোন থেকে যায় বাগেরহাটে। তার মার সাথে তার বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। সুলতানা চার ভাই-বোনের ভেতর বড়। বেশ অসহায় অবস্থা চলতে থাকে। অর্থনৈতিক কষ্ট সবচেয়ে বড় কষ্ট। বোটানির ছাত্রী ছিল সুলতানা। বাবা মোটেই টাকা-পয়সা না পাঠানোতে তাদের পরিবার খুবই অর্থনৈতিক কষ্টে পড়ে। ভাল ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও লেখাপড়া চালাতে পারলেন না। পারিবারিক ভরণ-পোষণ চালাবার জন্য টিউশনি করতেন, শাড়ী সেলাই করতেন, জামা-কাপড়ে নকশা আঁকতেন প্রভৃতি। তিনটি ছোট ভাই-বোনের লেখা-পড়ার খরচ চালাতে হতো। বেশ কষ্টকর অবস্থা। এ অসহায় অবস্থা দেখে মামারা-চাচারা আর তাদের বাসায় আসতো না। আগে মাঝে মাঝেই তারা আসত। মামারা-চাচারা ঈদে জামা-কাপড় দিত। এখন কেউ কিছু দেয় না। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে যাওয়াতে চাচাদের সাথে আর সম্পর্ক রইল না। নানার জমির কিছুটা অংশ মা পেতেন। এ দুর্দশাজনক অবস্থায় মা, মামাদের কাছে তার প্রাপ্য চাইতে গেলেন। তারা ধীক্কার দিয়ে মাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। সেই থেকে মামাদের সাথেও আর সম্পর্ক নেই। এমন অবস্থায় তারই বাড়ির কাছাকাছি আর একটি বাড়ির কালো স্বাস্থ্যবান দীর্ঘ দেহের অধিকারী এক লোক তাকে বিয়ের প্রস্তাব করল। প্রতিবেশী ঘটক এসে বিয়ের জন্য বেশ চাপ দিতে লাগল। সুলতানার মা এ বিয়েতে মোটেই রাজি নয়। কারণ ছেলেটি কোন চাকরী বা ব্যবসা করে না। দেখতে কিছুটা অসুন্দর। মাস্তানি করে। মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খায়। গুরুজন মানে না। এ রকম চরিত্রের কারো সাথে মেয়ে দিতে না চাওয়াটাই স্বাভাবিক। একদিন আর এক মাস্তান গোছের প্রতিবেশি পাঠিয়ে মেয়েকে জানিয়ে দিল, যদি সে বিয়েতে রাজি না হয়, তবে এসিড মারবে এবং তার ছোট বোনকে তুলে নিয়ে যাবে। এ কথা যেন কাউকে না বলে, সে জন্যও ধমক দিয়ে এল। বাবাহীন সংসার পালহীন নৌকার মতো। শেষে বাধ্য হয়েই সুলতানা বিয়েতে রাজি হল। কেউ কিছু বুঝতেও পারল না।
বিয়ের পর থেকে শুরু হল নানা প্রকার নির্যাতন। জ্বালানি কাঠ দিয়ে নিয়মিত প্রহার চলে। চুলার আগুনে মাথা ঠেসে ধরে। কথায় কথায় চড়, থাপ্পড়, লাথি এতো স্বাভাবিক ব্যাপার। পরে বহু কষ্টে চাকরীর জন্য চেষ্টা করে, এ বেসরকারী সংস্থায় চাকরি পেল। চাকরিটা সে পেয়েছে, তার বেতন জমা হয় ব্যাংকে। সর্বদা তার স্বামী বেতন তোলে। কখনো তাকে বেতন তুলতে দেয় না। সারা মাসের অফিসে যাতায়াতের জন্য খুব কম টাকা দেয়। মাঝে মাঝে আসা যাওয়ার জন্য সহকর্মীদের কাছ থেকে ধার নেয়া লাগে। কিন্তু কী করবে! সহকর্মীরা অনেক সময় অনেক খাবার কিনে আনে, সকলকে দেয়। সে দিতে পারে না। একদিন তার স্বামীকে একথা বোঝাতে গেলে কানের ওপর তিন-চারটি থাপ্পড় পড়েছিল, আর বলেছিল, ‘ওদের খাওয়াবি, ওরা কি তোর নাগর?’ মাস্তান গোছের লোকটি সমাজ-সামাজিকতা বোঝে না, এটাই স্বাভাবিক। সে একটি স্বর্ণ ডিম প্রসবিনী রাজহংসী পেয়েছে। একদিকে সুন্দরী স্ত্রী, আর দিকে মাসিক বেতন। বেচারির ভালই চলছে। তাদের পুরা সংসার চলে সুলতানার বেতনে। অথচ তার কোন আর্থিক স্বাধীনতা নেই। কখনো শ্বশুর পেটায়, কখনো শাশুড়ি, কখনো দেবর, কখনো ননদ আর স্বামীর প্রহারতো নিত্য প্রাপ্য। সে বহুবার ভেবেছে সংসার ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু পারে না। ইতোমধ্যে তার মা মারা গেছে। স্বামীর বাড়ি এসেছিল খুব ছোটবেলায়। জীবনের সব কিছুই সে তাকে দিয়েছে; অথচ শেষ জীবনে এসে আবারও বিয়ে করল। এ এক বিভীষিকাময় যাতনা, পাশাপাশি বড় মেয়েটি এমন একটি বিয়ে করল, এ সব কষ্ট সইতে না পেরে হার্ট ফেল করে একদিন চলে গেল। সুলতানার প্রথম সন্তান হয়েছে। এ সন্তান নিয়ে স্বামীর বাড়ি ত্যাগ করে সে কোথায় যাবে? বাবা থেকেও নেই, মা মারা গেছে। চাচারা-মামারা কেউ এখন ওদের চেনে না। চলে গেলে সমাজের অন্যরা কী বলবে? এ রকম নানা প্রকার প্রশ্ন তার মাথায় ভীড় করে; এবং অবশেষে নির্যাতিত হওয়া সত্ত্বে বাঙালি নারী হিসেবে সে স্বামীর ঘরেই থেকে যায়। সেই থেকে চলছে জীবনের আরেক অধ্যায়। সুলতানা খুব সংগ্রামী মেয়ে। সে অল্প জীবনেই অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেছে। সে ভাবল, অনার্স পড়া হলো না, অন্তত ডিগ্রী পড়ে গ্রাজুয়েট হতে হবে। ভর্তি হলো গোপনে। কারণ তার স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি কেউ চায় না, সে আর লেখাপড়া করুক। বাড়ি নিজে নিজে পড়ে। যেদিন তার স্বামী এ কথা জানল, সেদিন তার পিঠে জ্বালানি কাঠের সাতটি দাগ বসিযে দিল। তবু সুলতানা অদম্য। সে গ্রাজুয়েট হবেই। ঘরে বড় বালব জ্বালিয়ে পড়তে দেয় না, পাচ পাওয়ারের বালব জ্বালিয়ে রাখে। নিস্তেজ আলোয় কোন রকম চোখে দেখে সুলতানা পড়ে। মাঝে মাঝে পাশের বাড়ির আঙিনায় যে বাল্ব জ্বালানো থাকে, তার আলো এসে পড়ে সুলতানাদের বাড়ির বারান্দায়। সে ঐ আলোয় পড়া চালিয়ে নেয় কোন মতে। এভাবে সে ডিগ্রী পরীক্ষা দেয় এবং ভালভাবে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়। দিন যায় দিন আসে। সুলতানার ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। চাকরীর বেতন পুরাপুরি স্বামীর দখলে থাকে। কোন প্রয়োজনের কথা বলতে গেলেও মার খেতে হয়। এর ভেতর জন্ম নিয়েছে তার দ্বিতীয় সন্তান। ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে উঠতে থাকে। সুলতানা কষ্ট করে হলেও এম. এ পাশ করে; এমন কি বি. এড ও এম. এডও পাশ করে। সে আরও ভাল চাকরীর জন্য দরখাস্ত করে। এক সময় একটা সরকারি হাই স্কুলে চাকরী হয়। বেতন ও পদ মর্যাদা বাড়ে। কিন্তু তার ভাগ্যের তেমন কোন পরিবর্তন হয় না। যত বেতনই হোক না কেন সব স্বামীর হাতে থাকে। চেয়ে চেয়ে মাঝে মাঝে সুলতানা কিছু পায়। বহু বছরের সংসার কেমন এক ঘেয়েমি, সর্বদা অত্যাচারিত। সংসার ও জীবন তার কাছে ধূসর পাÐুলিপির মতো মনে হয়। শুধু বেঁচে থাকার জন্যই বেঁচে থাকা। অথবা মারা যেতে না পেরে বেঁচে থাকা। সুলতানা বহুবার আত্মহত্যা করতে গেছে; কিন্তু জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে সে পুরাপুরি সাহসী হয়ে উঠতে পারেনি। হাই স্কুলে
চাকরী হবার পর থেকে সুলতানার মেজাজ বেশ ফুরফুরে ও আনন্দময় হয়ে উঠেছে। তার এক সহকর্মী রয়েছে। পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি লম্বা। মাথাভরা কুচকুচে চুল। নীলাভ সবুজ চোখ। গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব। কিছুদিন হলো সুলতানার কী যে হলো, তার মানসপটে সেই সহকর্মীর চেহারা ভেসে থাকে। ঘুমালেও তার কথা মনে পড়ে, জেগে থাকলেও তার কথা মনে পড়ে। শয়নে-স্বপনে শুধু তারই প্রতিচ্ছবি আঁকে হৃদয়-বন্দরে। সুলতানা জানে না এমন হচ্ছে কেন বা পরবর্তীতে কী হতে চলেছে!
লেখক : কবি ও সম্পাদক