নাজনীন তৌহিদ

 মিতুল আর প্রীতারা নতুন একটি বাসায় উঠেছে। এই বাসাটির কাছেই আব্বুর অফিস। আর বাসার পাশেই যে স্কুলটা ওখানেই প্রীতাকে ভর্তি করা হবে। মিতুল তো আগে থেকেই এই স্কুলটাতে পড়ত। ওদের আগের ফ্ল্যাটে অনেক বন্ধু ছিল। ওদের কে ছেড়ে আসতে মিতুল এবং প্রীতা দুজনারই মন খারাপ হয়েছিল। আম্মুর ওপর সেজন্য রাগও হয়েছিল।

  কিন্তু এখানে না এলে ওদের একটা জিনিস দেখাই হত না। কি তা জানো? কাকের বাসা। ভাবছ, ইস! রোজ রোজ কতই তো কাক দেখি। বিল্ডিং এর ছাদের উপরে এসে কাক হাগু করে দেয়। ইলেকট্রিক তারের উপর বসেও টুপ করে কখনো কখনো কারো মাথার উপর হাগু করে দিয়েছে। তাই কাককে হয়ত তুমি একদম পছন্দ কর না।

  কিন্তু তুমি কি জান কাক কত ভাল পাখি! ওর অনেক মায়া।

  তোমরা তো এটি কথা জাননা যে কোকিল বাসা বাঁধতে পারে না। ওরা কী করে, কাকের বাসাতে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ডিম পাড়ে। তারপর যখন ডিম থেকে কোকিলের বাচ্চা ফোটে কাক কিন্তু তাকে একটুও তাড়িয়ে দেয় না, বকাও দেয় না। কাক নিজের বাচ্চা এবং কোকিলের সে বাচ্চাগুলোকে ভীষণ আদর করতে থাকে। সব বাচ্চাগুলো তখন মা-কাকটিকে কা-কা বলে ডাকে, মানে মা-মা বলে ডাকে। ওদের ভাষাতো আমরা বুঝি না, তাই কা কা শুনতে পাই।

  তো এবার মজার কথাটিই বলি। মিতুল আর প্রীতা যে রুমটাতো ঘুমাতো সে রুমের কাছেই ওয়ালটার ওপাড়েই একটি আমগাছ। হঠাৎ একদিন মিতুল দেখে, সেই গাছটিতে একটি কাকের বাসা। কাক যে বাসা বাঁধে তাতো ওদের জানাই ছিল না। বাসাটিতে একটি মা কাক আর একটি বাবা কাক রোজ রোজ এসে বসে থাকে। কয়েকদিন পর দেখে কি মা কাকটা শুধুই বাসায় বসে থাকে। মাঝে মাঝে কেবল ক্ষুধা লাগেলই উড়ে গিয়ে একটু খাবার খেয়ে আবার বাসায় এসে বসে থাকে।

 ওমা! একদিন সকালবেলা স্কুলে যাবার আগে ওরা দেখে  চিউ চিউ করে বাসার মধ্যে কি যেন নড়ছে। আম্মু বললেন কাকের ডিম থেকে ছা ফুটেছে। মিতুল আর প্রীতার ছাগুলো দেখে কি যে আনন্দ হলো!  স্কুলে গিয়ে সবাইকে তা জানিয়ে দিল। সবাই তখন ওদের বাসায় আসতে চাইল।

  আম্মু বললেন আসতে পারবে তবে পাখিকে বিরক্ত করা যাবে না। চুপি চুপি কোন রকম শব্দ ছাড়াই ওদেরকে দেখতে হবে। একে একে বন্ধুরা এল এমনকি ওদের ক্লাস টিচারও এসে কাকের ছানা গুলো দেখে গেল। ওদের তখন কী যে মজার দিন! একটু পরপর  কাক এবং তার ছানাগুলো কী করে তা দেখে দেখে সময় পার করছিল। মা কাকটা মাঝে মাঝে খাবার এনে বাচ্চাদের কাছে এসে ওদের ঠোঁটের সাথে ঠোঁট মিশিয়ে খাবার খাওয়ায়। তুলতুলে নরম মাংস, ওদের তখনও পাখায় পালক হয়নি। ঠোঁটগুলো লাল লাল।   ছাগুলো দেখতে কত সুন্দর!

  একটু একটু করে ছাগুলো বড় হতে লাগল। আস্তে আস্তে ফিস ফিস করে খা খা করে ডাকতে শিখল। একপা দুপা করে বাসাটার পাশে আমগাছের ডালে এসে দাঁড়ায়। মা আর বাবা কাক ওদের পাশে এসে অনেক আদর করে। প্রীতা তখন গুনে দেখল তিনটা ছা। বাবা-মা মিলে মোট পাঁচটি কাক।

  হঠাৎ একদিন ঝড়ে বাসাটি ভেঙ্গে গেল। তবু কাকগুলো গাছটি ছেড়ে কোথাও যায় না। মাঝে মাঝে মিতুল আম্মুর রান্নার সময় মাংস, মাছের ছোট টুকরো এনে হাতে ধরে আয় আয় বললে ওরা চলে আসে। তারপর ওদেরকে দেখিয়ে খাবারটি ছুড়ে দিলে ওরা তা টুকিয়ে টুকিয়ে নিয়ে গাছের ডালে বসে টুকে টুকে খায়।

  কিন্তু ছাগুলো যতই বড় হচ্ছিল মিতুল আর প্রীতার ততই চিন্তা হচ্ছিল, ওরা যদি এখন উড়ে দূরে চলে যায়! আম্মু বললেন, হ্যা বড় হলে তো উড়ে যাবেই। তাতে কী? তোমরা ওদেরকে আদর করলে ওরা আবার কাছে আসবে। বাসা বাঁধবে, ডিম পাড়বে তারপর বাচ্চা ফোটাবে।

লেখক: উপসম্পাদক, বিজয় প্রতিদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *