কুমার অরবিন্দ

এক  

দীর্ঘস্থায়ী সুখের কারণ যদি ক্ষণিকের দুঃখ হয়ে থাকে তবে সেই দুঃখ মানুষকে ব্যথিত করে না, দুঃখের মাঝেও মনকে পুলকিত করে। হরিদাসী বালার মৃত্যু তাঁর প্রসব করা চার ছেলের বউকে সকাল থেকে এমনই পুলকিত করছে। তবে চক্ষুলজ্জার খাতিরে বউগুলো মাঝেমধ্যেই চোখের জল মুছছে। ছেলেগুলো মায়ের মৃত্যুতে কিছুটা ব্যথিত, কিন্তু একটা স্বস্তির আভাসও তারা পাচ্ছে। 

হরিদাসীর প্রাণহীন শরীরটাকে উত্তর দিকে মাথা রেখে উঠোনে শুইয়ে রাখা হয়েছে। যে তুলসী গাছটাতে সন্ধ্যাবেলা প্রদীপ জ্বালাতেন, মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতেন সেই গাছটার পাশেই তিনি এখন নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে আছেন।

নিয়মিত জল পাওয়া তুলসীগাছটা বেশ নাদুসনুদুস হয়েছে। তারই দুইটি পরিপুষ্ট পাতা হরিদাসীর বন্ধ দুই চোখের ওপর আর একটি বুকের ওপর রাখা। আপাতত তুলসী দেবী কে কয়েকটি পাতা প্রতিদান দিয়েছেন। নিয়মিত গাছটাকে সেবা করার জন্য চিত্রগুপ্ত পুণ্যের খাতায় কিছু লিখেছেন কিনা বা যমরাজের হিসাবের দিনে তুলসী দেবী হরিদাসীর পক্ষে কিছু বলবেন কিনা তা আমরা বলতে পারি না।

সবচেয়ে পুরোন কাঁথাটা দিয়ে মৃতের গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে দেয়া হয়েছে। ভিড় করে লোকজন হরিদাসীকে শেষ দেখা দেখবার জন্য আসছে। তাই মুখটা এখন আলগা। দশ এগারো বছরের এক নাতনি এসে বাইরে বের হয়ে যাওয়া চুলগুলো গুঁজে দিয়েছে তাঁর ঘাড়ের নিচে।  

ছেলেরা নিজের মাকে নিয়ে বিলাপ করে কিছুক্ষণ কান্না করেছে। তারা এখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মাকে শ্মশানে নেবার যোগাড় করার জন্য। মাকে দাহ করতে অন্তত পাঁচ মণ কাঠ লাগবে। কোন কোন গাছ কাটলে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতি হবে সেই হিসাব কষতে চার ভাই ও গ্রামের কিছু লোক মিলে বসেছে। তারা হিসাব করছে ছোট একটা আমগাছ না কাটলে হরিদাসীর দেহ দাহ করা সম্ভব নয়।

বড় মেয়ের বাড়ি থেকে একটা আমের আঁটি এনে পুঁতেছিলেন হরিদাসী। সেই গাছটাই কাটার সিদ্ধান্ত হয়েছে। হরিদাসী এই গাছের আম কখনো খেতে পারেননি। অল্প ধরত, ভাগে পেতেন না। এখন পুরো গাছটাই ছেলেরা তাঁর সঙ্গে দিচ্ছে!

মেয়েরা এসেছে মাকে শেষ দেখা দেখতে। মাকে নিয়ে তারা স্মৃতি রোমান্থন করছে। মেজ মেয়ে বলছে, এই শীতেই তার বাড়িতে যাবার কথা ছিল মায়ের। কিন্তু আর হলো না। আমার বাড়িতে যাবার আগেই মা সবাইকে ছেড়ে চলে গেলো।

ছোট মেয়ে কমলিকা কান্না করছে বেশি। অনেক দূরে বিয়ে হবার জন্য বাপের বাড়ি তেমন আসার সুযোগ পেত না। মাকে যেতে বললেও মা যেতে পারতেন না। স্বামী খারাপ হবার কারণে বাপের বাড়ির সঙ্গে স¤পর্কও তেমন ভালো ছিল না। প্রায় দুই বছর পর যখন বাপের বাড়ি এলো তখন মা নেই।

কমলিকা মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়েই অস্থির হয়ে পড়ে। মনে কু ডাক ডাকতে থাকে। স্বামীকে বোঝায়, মার শরিল নাকি বেশি খারাপ, এট্টু দেহে আসি। কহন কি হয়…! নৃপেন অন্য সময়ের মতো বউকে এবার মানা করেনি। 

অনেকদিন পরে মাকে দেখতে যাচ্ছে বলে কমলিকা মায়ের জন্য এক পোয়া আঙুর আর আধা কেজি কমলা কেনে। ছোট এক পাতিল দইও আনে। এগুলো দেখে বৃদ্ধ মা কেমন খুশি হবে তা ভাবতে থাকে কমলিকা। সে নিশ্চিত জানে, মা বলবে, এত টাহা খরচ করে এসব আনছিস ক্যা? তোর ছাওয়াল মেয়েরে ডাক দে। এসব বলতে বলতেই মায়ের কাঁঠালের কোয়ার মতো ঘোলাটে চোখ ছলছল করে উঠবে। মাকে এবার তার সাথে নিয়ে যাবে। অভাবের সংসার হলেও থাকবে না হয় তার সঙ্গে কিছুদিন।

কমলিকা যখন হরিদাসীকে নিয়ে এতসব ভাবছে ততক্ষণ হরিদাসীর প্রাণহীন দেহটা উঠোনে নেমে এসেছে। তুলসী গাছটার কোলে তিনি মাথা রেখে শুয়ে আছেন।

মৃত্যুর আগে অসুস্থ হয়ে হরিদাসী বিছানায় ছিলেন দুইদিন। পৃথিবীর বুকে তিনি বাহাত্তর বছর টিকে ছিলেন। ভগবান তাঁকে সন্তান ও নাতি-নাতনি কম দেননি।

স্বামী দুর্গাদাস মারা গিয়েছেন চৌদ্দ বছর আগে। এই চৌদ্দ বছরে তিনি তাঁর চারপাশের জগৎকে নতুন চোখে দেখেছেন, নতুন ভাবনায় বুঝেছেন।  

হরিদাসীর চার ছেলের প্রথম দুইজন মাঠে কাজ করে, পরের দুইজন করে সিজনাল ব্যবসা। স্বামী মারা যাবার পরের বছরই এক সংসার চার টুকরো হয়েছে। ভাগ করে নেয়া ছেলেদের সংসার খুব ভালো না চললেও টানাটানির নয়। খেয়ে-পরে তাদের খারাপ চলছে না।

স্বামীর সংসার চার ছেলে ভাগ করে নিলেও হরিদাসীর কপালে স্বামীর কিছুই জোটেনি। নিজের রক্ত জল করা সংসার ছেলে আর ছেলের বউরা মিলে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে। স্বামীর ব্যবহার্য কিছু জিনিসপত্র উত্তরাধিকার বলে তারা কাড়াকাড়ি করে নিজেদের দখলে নিয়েছে। অথচ চল্লিশটা বছর যার সঙ্গে সংসার করল সেই মানুষটার অবর্তমানে তাঁর কোনো স¤পত্তিতে হরিদাসীর কোনো অধিকার জন্মাল না! তিনি নিজেও তো সংসারের জন্য কম করেননি। অতগুলো বাচ্চা বড় করার মাঝেও স্বামীর সঙ্গে সমানতালে কাজ করেছেন। রাত দিনের ফারাক বোঝেননি। নিজের সব গয়না স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। দুর্গাদাস তা বেচে জমি কেনেন। তিনি নিজ হাতে আরও যা কিছু করেছেন তাতেও তাঁর ভাগ নেই, অধিকার নেই! কোন আইন অনুসারে নিজের গয়না বেচা টাকায় কেনা জমি, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে গড়া এই সংসারের সবকিছুই স্বামীর হলো! আর স্বামীর যদি হয়েও থাকে তাতে তাঁরই পেটে ধরা ছেলেদের অধিকার থাকলেও তাঁর কোনো অধিকার রইল না কেন? সেই আইনখান চোখের সামনে পেলে হরিদাসী একবার থুথু ফেলত।  

হরিদাসীকে চারভাগ করা গেলো না বলে তাঁকে কোনো ছেলের ভাগেই ফেলা গেলো না। নানা অজুহাতে পুরো হরিদাসীকে কোনো ছেলেই নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি হলো না। সবারই ছেলেমেয়ে আছে। তাদের খাওয়ানো পরানোতেই গলদঘর্ম হতে হবে। বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো মাকে কে নেবে? তাছাড়া নিজের সঙ্গে রেখে মাকে কেউ কষ্ট দিতে চায় না!

হরিদাসীর বিষয়ে মেয়েদেরকে জানানো হলো। মেয়েরা বলল, দাদারা আছে, মাকে দেখার দায়িত্ব তাদের। আমরা নিজেরাই আছি পরের সংসারে।

ছেলেমেয়েরা যখন সবাই হরিদাসীকে খাওয়াতে অরাজি তখন গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে তাঁর ঠিকানা নির্ধারণের চেষ্টা করা হলো। মতবররা ছেলেদেরকে নিয়ে বসলেন এবং সিদ্ধান্ত দিলেন যে, চার ছেলের সংসারে তিনি তিন মাস করে খাবেন। তবে তাঁর থাকার জন্য ছোট ছেলের ঘরের সঙ্গে একটা একচালা বেঁধে দেয়া হবে। চার ছেলে মিলেই মায়ের থাকার জন্য এই কাজটুকু করবে।

স্বামীর সঙ্গে তিনি যে ঘরে থাকতেন সেটা সেজ ছেলের ভাগে গিয়েছে। এই ছেলের দুই মেয়ে এক ছেলে। তাদের জন্য স্বামীর স্মৃতি জড়ানো ঘরটা হরিদাসীকে ছাড়তে হয়েছে। এখন শন দিয়ে ছাওয়া একচালার নিচে শুয়ে হরিদাসী জীবনের হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেন। পারেন না। লেখাপড়া না জানলেও তিনি বুঝতে পারেন লেখাপড়া জানা মানুষও এই হিসাব মেলাতে পারবে না।

চার ছেলে আর তিন মেয়েকে জন্ম দিতে গিয়ে তিনি তিন-চারবার মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছেন। এই ছেলেমেয়েদের বড় করতে গিয়ে কত রাত তাঁকে নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে সেই হিসাব তাঁর কাছে নেই। অথচ একচালার নিচে আজও তিনি নির্ঘুম। সন্তানদের জন্য, সন্তানদের কারণে সারাজীবন কি তাঁকে নির্ঘুম কাটাতে হবে? শুয়ে থেকে তিনি মাঝেমধ্যে ওপরের দিকে তাকান। শনের চাল ভেদ করে তাঁর ক্ষয়ে যাওয়া দৃষ্টি আর ওপরে যায় না। ভগবান তো আরও ওপরে থাকেন?

স্বামী মারা যাবার পর চৌদ্দ বছর পার করেছেন হরিদাসী। যখন যে তিন মাস যে ছেলের সংসারে খাবার খান সেই তিন মাস সেই ছেলের সংসারে সাধ্যমতো তাঁকে কাজ করে দিতে হয়। সত্তর পার করা বয়সেও ছেলেদের সংসারে কাজের বিনিময়ে তিনি দুমুঠো ভাত পান। সবার খাওয়া শেষ হলে তাঁর খাবারের ডাক আসে। বেশিরভাগ দিনে মাছ ছাড়া তরকারির ঝোল আর একটু ডাল জোটে। সবাইকে দেয়ার পর তাঁর পর্যন্ত মাছের টুকরো পৌঁছায় না। বউমারা দয়া করে মাঝেমধ্যে লেজের অংশ দেয়। চোখ এখনো পুরোপুরি না গেলেও অনেকটাই গেছে। বেশি কাটার জন্য মাছের লেজ খেতে তাঁর কষ্ট হয়। তাঁর ইচ্ছে করে মাছের মাথা খেতে। কতদিন যে মাছের মাথা দিয়ে ভাত খায়নি মনে করতে পারেন না হরিদাসী।

বিয়ের আগে একবার খেয়েছিলেন। বাবার সঙ্গে খেতে বসে। বাবা তাঁর পাতে রুই মাছের একটা বড় মাথা তুলে দিয়েছিলেন। বিয়ের পরেও  খেয়েছেন। তবে তা স্বামীর খেতে না পারা কিছু অংশ। ছেলেরা বড় হলে মাছের মাথাগুলো ছেলেদের পাতেই তুলে দিতেন। ছেলেদের তৃপ্তি করে খাওয়া দেখতেন। ছেলেদের খাওয়া দেখে তাঁর নিজের খাওয়া হয়ে যেত। একদিন নাতিকে কাতল মাছের মাথা খেতে দেখে বলেছিলেন, অত বড় মাচের মাতা খাতি পারবেন?

নাতি মাছের মাথায় কামড় দিতে দিতে বলেছিল, তুমি এদিক চোখ দিয়ে না। তোমার তো দাঁতই নেই।

হরিদাসী আর কিছু বলেননি। মাছের মাথা খাওয়ার মতো দাঁত তাঁর এখনো পড়ে যায়নি। আর দাঁত থাকলেও কি…?

হরিদাসীর এখন কেমন যেন খাইখাই বেড়েছে। অনেক কিছুই তাঁর খেতে ইচ্ছে করে। আগে এমন কখনও হয়নি। খেজুর রসের পায়েস, ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুশাকের ঘণ্ট, ছোট মাছের চচ্চড়ি আরও কত কি খেতে মন চায়।  

তেল চিটচিটে বালিশটায় মাথা রাখেন হরিদাসী। সকাল থেকেই কেমন শীত শীত করছে। দুদিন ধরে জ্বর আসছে, যাচ্ছে। এখন রাত কত হবে বুঝতে পারেন না তিনি। বেশ খিদে লেগেছে। আরও অনেকক্ষণ পর বড় ছেলের মেয়ে বেলাকে বলতে শোনে, মা, ঠাকুমাকে খাতি ডাক দেই?

বেলার ছোট ভাই বঙ্কু দিদির ভুল শুধরে দিয়ে বলে, ঠাকুমা এহন আমাগের ভাগে নাকি? বীথিগের ভাগে। আমরা খাতি দেবো ক্যা?

হরিদাসীর যতটুকু ক্ষুধা লেগেছিল নাতির কথা শুনে সেটা চলে যায়। ছেলে আর ছেলের বউ পাশে থাকলেও বঙ্কুর কথায় তারা কোনো প্রতিবাদ করেনি। নাতির কথায় তাদের নীরব সমর্থন আছে।

হরিদাসীর ঘোলাটে চোখের কোনা বেয়ে জল চুইয়ে পড়ে। ভাগ তো তিনি চৌদ্দ বছর আগেই হয়েছেন। মাকে একমুঠো খাবার দেবে সেজন্য মা কার ভাগে খায় সে হিসাব করতে হবে! মনে মনে ভগবানকে বলে, ঠাকুর, তুমার কিপায় পিথিবিতে অনেক খাইচি। আর খাওয়ার স্বাদ নাই। যদি সগগে নেও তালি কল্পতরুর কাচে যায়ে চাব। তোমার কাচে আমার আর কোনো চাওয়া নাই।

ক্ষুধা পেটে নিয়েই শুয়ে থাকেন হরিদাসী। ঘুম আসে না। কত কি চিন্তা করতে থাকেন। কত মানুষকে কত কি বলার ছিল। সে সব কথা তিনি ভগবানকে বলেন। ভগবান শোনেন কিনা তিনি জানেন না। তবু তিনি বলবেন। তাঁদের মতো মানুষের শেষ ভরসা তো সেই পতিতপাবন।

সাত-পাঁচ চিন্তা করতে করতেই ঘুমের মধ্যে হরিদাসীর অনন্ত ঘুমের ডাক আসে। ক্ষুধা পেটে বেশিক্ষণ ঘুমানো যায় না কিন্তু হরিদাসী নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে রইলেন। গতরাতে ভগবানের কাছে তিনি কি অনন্ত ঘুমের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন? 

চার ছেলে আর তিন মেয়েকে মাতৃহীন করে হরিদাসী মারা গিয়েছেন। মেয়েগুলো আসার পর শোকের কান্নায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। চার ছেলের বউ সকাল থেকে কখনো পালাক্রমে কখনোবা যৌথভাবে শাশুড়িকে কেন্দ্রে রেখে কিছু চোখের জলের অপচয় করেছে!  

কয়েক মিনিটের ব্যবধানে হরিদাসীর বড় ও মেজ মেয়ে আসে। মায়ের শরীর কয়েকদিন ধরে ভালো-মন্দের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মায়ের শরীর বেশি খারাপ মোবাইলে এই খবর পেয়েই তারা বুঝে গেছে- মা আর নেই। দুই ননদকে মায়ের জন্য কাঁদতে দেখে শাশুড়িকে হারানোর শোক চার বউয়ের মধ্যে নতুন করে জাগ্রত হয়।

ছোট মেয়ে কমলিকা এসেছে আরও ঘণ্টা দুয়েক পড়ে। মায়ের জন্য আনা আঙুর, কমলার প্যাকেট হাত থেকে খসে পড়ে তার। দৌড়ে ভিড় ঠেলে ভেতরে উঁকি দেয়। কমলিকা মা বলে ডুকরে কেঁদে ওঠে। চোখের পাতা দুটি তুলসী পাতায় ছাওয়া বলে হরিদাসী কোনো মেয়েকেই দেখতে পেলেন না।

দুই 

হরিদাসীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ভালো ভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। গ্রামের প্রায় প্রত্যেক পরিবার থেকে একজন করে শ্মশানে গিয়েছিল হরিদাসীর প্রাণহীন দেহটাকে দাহ করার জন্য। জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে নরেশ মায়ের মুখাগ্নি করে।

মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি ও পারমার্থিক উন্নতির জন্য ওই ব্যক্তির সন্তানগণকে কিছু আচার-অনুষ্ঠান, নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। হরিদাসীর সন্তানেরাও তা মানে। তের দিন অশৌচ পালন করে। পরনে সেলাইহীন সাদা থান, গায়েও একখণ্ড কাপড় চাদরের মতো জড়িয়ে রাখে। গলায় লোহার চাবি ঝোলানো কাছা। খালি পা। ঘর বন্ধ করে একটি মাটির সরায় কাঠের আগুনে আতপ চাল ও সবজি ফুটিয়ে সেদ্ধ করে খায়। চব্বিশ ঘণ্টা সারা শরীরে মায়ের জন্য শোকের বিজ্ঞাপন জড়িয়ে তারা ঘোরে। 

রাতে তারা খায় ফলমূল, ভেজানো সাবুদানা বা আতপ চালের ভাত এবং না ফোটানো দুধ। সকালে ¯œান করে এসে উঠোনের পাশে নতুন করে লাগানো তুলসী গাছে প্রতিদিন মায়ের উদ্দেশ্যে জল ও দুধ প্রদান করে। মায়ের নামে চতুর্থ ও দশম দিনেও নিয়ম মেনে পূরক পিণ্ড দান করে।  মাঘ মাসের শীতের মধ্যেও ছেলেরা বিছানায় শুতে পারছে না। মা মারা যাবার পর বিভিন্ন সংস্কার স¤পর্কে প্রচলিত সকল নিয়ম-কানুন ছেলেরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে। এই শীতেও মৃত মায়ের জন্য তাদের এমন কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন এলাকার সবাই প্রশংসার চোখে দেখছে। মায়ের প্রতি ভক্তি আছে ছেলেদের! 

শ্রাদ্ধের আগের দিন গ্রামের নরসুন্দর এসে ছেলেদের মাথা মুদ্রন করে দিয়েছে। তারা স্মান শেষে নতুন সাদা থান কাপড় আর উত্তরীয় গায়ে জড়ায়। শ্রাদ্ধের দিন দুইজন ব্রাহ্মণ এসে তুলসী পাতা, গঙ্গাজল, তিল, ফুল, আতপ চাল দিয়ে কিছু মুখস্ত মন্ত্র পড়ে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। হরিদাসীর স্বর্গে গমনের পথ প্রশ্বস্থ করে!

হরিদাসী যা যা ভালোবাসতেন, যা যা ব্যবহার করতেন ব্রাহ্মণরা আগেই তার একটা লম্বা লিস্ট দিয়েছিল। হরিদাসীর ছেলেরা দক্ষিণাসহ সাধ্যমত ব্রাহ্মণদের সেসব দিয়ে খুশি করে। শ্রাদ্ধ ভালোভাবে হলেই না মায়ের আত্মা স্বর্গে প্রবেশাধিকার পাবে! 

নরেশদের গোষ্টি বড়। তাই আত্মীয়দের তালিকাটা লম্বা। এলাকার লোকজন, আত্মীয়-স্বজন মিলিয়ে প্রায় নয়শ লোককে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। মাকে দুবেলা খাবার দিতে যাদের কষ্ট হতো তারা আজ দ্বিধাহীন চিত্তে হাজার লোককে খাওয়ানোর আয়োজন করছে! 

সকাল থেকে শ্রীমদ্ভবতগীতা পাঠ করছেন গ্রামেরই এক পাঠক। আমন্ত্রিত অতিথিরা যাঁরা এসেছেন তাঁরা গীতা পাঠ শুনছেন। প্রাসঙ্গিক মনে করলে তিনি মাতৃভক্তি, পিতৃভক্তির কথা বলছেন। তিনি অশ্রুসিক্ত চোখে বলছেন, মা হলেন সাক্ষাৎ দেবী। জীবিত মাকে সেবা করলে সকল দেবতাকে পূজা করার পুণ্যফল পাওয়া যায়। পৃথিবীতে যার মা নেই তার কেউ নেই। তারাই কেবল জানে মাকে হারানোর বেদনা কতটুকু, যারা মাকে হারিয়েছে। যেমন এই পরিবারের সদস্যবৃন্দ মাকে হারিয়ে আজ শোকের সাগরে ভাসছে…। 

পাঠকের মাতৃভক্তির কথা শুনে শ্রোতাদের চোখে জল আসে। হরিদাসীর ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে সবাই কেঁদে কেঁদে উপস্থিত আমন্ত্রিত ভক্তবৃন্দের চরণধূলি নেয়। তারাও তো মায়ের জন্য কম কিছু করছে না!

হাজার মানুষের রান্না প্রায় শেষ। আলুভাজি, দুই প্রকার ডাল, মাছের মাথা দিয়ে মুড়িঘণ্ট, রুইমাছের তরকারি, টমেটোর চাটনি সাথে আছে দই-মিষ্টি। রান্না শেষে সকল প্রকার খাবারের কিছু কিছু নিয়ে বড় বউমা থার্মোকলের ওয়ানটাইম থালায় সাজায়। মেজ বউ বাটিতে সবচেয়ে বড় রুই মাছের মাথাটা নিয়ে আসে। মাথাটা রাখা হয় প্লেটের মাঝে। নরেশ থালাটা মাথায় করে। হরিদাসীর বাকি ছেলেমেয়ে, বউমা ও অন্যরা নরেশের পেছন পেছন গ্লাসে জল নিয়ে নদীর ঘাটে যায়।

নদীর পাড়ে একটা পরিষ্কার জায়গায় জল ছিটিয়ে তারা মায়ের জন্য আনা খাবারগুলো সাজিয়ে রাখে। হরিদাসী বেঁচে থাকতে কখনো এত প্রকার খাবার একসাথে চোখে দেখেননি। না খেয়ে মারা যাবার পর তাঁরই উদ্দেশ্যে ছেলেমেয়েরা তাঁর জন্য এত খাবার এনেছে!

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী কাকের রূপ ধরে মৃত ব্যাক্তি এসে খাবার খাবে। নরেশ ও তার ভাই-বোনেরা হাতজোড় করে কা কা কা বলে কাককে ডাকতে থাকে।

কাক এসে খাবার খেলে বা কাক এখানে এলে তবে তারা এখান থেকে যাবে। তারপর না খেয়ে মরা হরিদাসীর শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হাজারখানেক অতিথি পেটভরে খাবে।

কয়েকটি ক্ষুধার্ত কাক নিচে খাবার দেখে ওপরে কয়েক পাক ঘুরে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে বসে। এদের মধ্যে কোনটি মা নরেশ তা জানে না। সে আবার কাক আয়, আয় বলে ডেকে মৃত হরিদাসীর উদ্দেশ্যে খাবারগুলো রেখে পেছনে না তাকিয়ে চলে যায়।

লেখক: গল্পকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *