রেজাউল হক চৌধুরী মোস্তাক

দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তানকে নিয়ে আজব ও অভিনব যে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি গঠিত হয়েছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছয় দফা ভিত্তিক স্বায়ত্বশাসন দাবী উত্থাপন করায় পাঞ্জাব নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তথা এলিট শ্রেণি বাঙালি জনগোষ্ঠীর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। বিশেষ করে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবী পেশ করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে দেশদ্রোহী হিসাবে চিহ্নিত করে। তারই ধারাবাহিকতায় ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র‘ নামে একটি মামলা দায়ের করে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা। উনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাগ্রত বাঙালী শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু‘ নামে অভিধায় অধিষ্ঠিত করে বাঙালী হৃদয়ে স্থায়ী আসনে বসান।

৭০এর নির্বাচনে তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ট জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা না রেখে এবং পাকিস্তানী সামরিক জান্তা সংখ্যাগরিষ্ট জনগণের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তানান্তর না করে বরং এই জনপদের আপামর জনগণের উপর গণহত্যার অভিযান শুরু করে। পাকিস্তানি সেনারা বাঙ্গালী নিধনযজ্ঞে লেগে ২৫ মার্চ, ৭১ এর রাত থেকে আগুন লাগিয়ে বাড়ী-ঘর ধ্বংস করলো। বাস্তুহারা, বিত্তহারা ও গৃহহারা মানুষ আতংকিত হয়ে যেদিক দিয়ে পারে ছুটে যেতে লাগল। ‘‘২৬ মার্চ থেকে চলতে থাকে হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষের পদযাত্রা। তাঁরা সবাই শহর ছেড়ে যাচ্ছেন। অনেকের গন্তব্য নিজ নিজ গ্রামে। যাঁদের আর কোনো ঠিকানা নেই, তাঁরা ক্রমাগত হাঁটছেন ভারত সীমান্তের দিকে‘‘।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধীর নির্দেশে ভারত সরকার শরনার্থীদের সমাদরে গ্রহন করে আশ্রয় প্রদান করেন। শরনার্থীদের বৃহৎ অংশ পশ্চিমবাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও মিজোরাম, মণিপুর গিয়ে আশ্রয় নেয়। ভারতের এই অঞ্চলের মানুষ আন্তরিকভাবে সবাইকে গ্রহন করে । অনেকেই নিজেদের বাড়ীঘরের অংশ স্বরণার্থীদের জন্য ছেড়ে দেয়। যাত্রাপথে অসুখ-বিসুখ ও মৃত্যুকে পেরিয়ে যারা ভারতে প্রবেশ করে ভারত সরকার অচিরেই তাদের আশ্রয় শিবিরে থাকার ও খাবারের ব্যবস্থা করে দেন। অনেকে ভারতে তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা নির্মমভাবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অত্যাচার করেছে, লুণ্ঠন করেছে এবং নারী নির্যাতন ও গণহত্যা চালিয়ে এ জনপদের মানুষকে ভীতসন্ত্রস্থ করেছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারত সরকার  ও ভারতের জনগণ সম্পূর্ণভাবে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের মানুষের রক্তে যখন এখানকার মাটি সিক্ত হয়ে ওঠে, মনে হয়েছে তখন ভারতীয়দের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। ভাইয়ের সামনে ভাইকে হত্যা করলে যেমন অনুভূতি হয়, সে সুতীব্র বেদনা ভারতীয়রা অহরহ অনুভব করেছিল।

পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে যে, প্রায় ১কোটি শরনার্থী ৮২৯টি ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণ করে। অনেকে সাময়িক আবাস/বাসস্থান তৈরী করে। বিশ্বে এটি একটি বিরল ঘটনা। ভারত সরকারকে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য অবকাঠামো তৈরী করতে বিস্তর বেগ পেতে হয়েছে। 

স্বরণার্থীরা যাত্রাপথে অনেকে মারা গেছে পাকিস্তানী সৈন্যের হাতে। তবে বাংলার ছাত্রসমাজ,যুবসমাজ, কৃষক-শ্রমিক মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ল। প্রতিরোধ যুদ্ধরত ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্স ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাথে মুক্তিবাহিনী যোগ দিল। মুক্তিবাহিনীর জন্য ভারত বিভিন্নস্থানে ক্যাম্প স্থাপন করল, প্রশিক্ষক ও অস্ত্রশস্ত্র দিল। ক্রমাগত মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি বাড়তে থাকলো। 

৩০ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদ কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে  প্রবেশ করেন। তিনি একটি সামরিক কার্গো বিমানে করে ১ এপ্রিল দিল্লী রওনা হন। ৪ এপ্রিল তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। অতঃপর ১৭ই  এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগরে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে প্রথম অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার ও মন্ত্রিসভা গঠন করে কলকাতায়  প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সামগ্রিক সহযোগীতার আশ্বাস প্রদান করেন। 

সামগ্রীক সহযোগীতার ফলস্বরূপ ভারতীয় সরকার প্রতি স্বরণার্থীকে ৩০০গ্রাম চাল, ১০০গ্রাম ময়দা, ২৫গ্রাম করে ঘি ও চিনি দিত।  এগুলো দেওয়ার কারণ ছিল যাতে শরনার্থীরা অন্তত মানবদেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টির চাহিদা মেঠাতে পারে। কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদীও ছিল। যুদ্ধ শেষ হয়ে ক্যাম্পগুলো বন্ধ হওয়া পর্যন্ত এই ভারতীয় বদান্যতায় এরকম মানবিক সাহায্য চলতে থাকে ১৯৭১ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত। হয়তোবা বিদেশি সাহায্যসমেত বাঙালীদের জন্য ভারত সরকার খরচ করেছে ১ বিলিয়ন ডলার। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধী তার অধিনস্ত সবাইকে নির্দেশ দেন যেন বাঙ্গালী শরনার্থীদের, মুক্তিযোদ্ধাদেরকে এবং অস্থায়ী সরকারকে পূর্ণ সহায়তা করার জন্য। 

পূর্বাঞ্চলের জনপ্রতিধিদের অধিবেশন বিভিন্ন সময় ডাকা হতো আগরতলায়। পূর্বাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষ অবস্থা, তাঁর গতিধারা, শরনার্থীদের/মুক্তিযুদ্ধাদের ক্যাম্পসমূহের ব্যবস্থাপনাসহ সকল জাতীয় বিষয়ে আলোচনা এবং অস্থায়ী সরকারের নিকট সুপারিশসমূহ প্রেরণ করা হতো। অনেকসময় জনপ্রতিনিধিদের অধিবেশন ডাকা হতো ভারতের পূর্বাঞ্চলের সেনাঘাটি দার্জিলিং এর সন্নিকটে পাহাড়ি এলাকা বাগডোরায়। 

এছাড়াও ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের গেরিলাদের জন্য ভারতের বিহার, অরুনাচল, আসাম, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করে। মুক্তিবাহিনী ক্রমাগত বাঙলাদেশের অভ্যন্তরে গিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যদের নাজেহাল করতে থাকে। জুন ১৯৭১এ যুদ্ধরত সেক্টরগুলোকে ১১টি ভাগে ভাগ  করা হয় এক একটা সেক্টর একজন কমান্ডারের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্যতার কারনে ত্রিপুরা ও পশ্চিম বঙ্গকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের যুদ্ধ রুদ্রমূর্তি ধারন করে।

অবশেষে ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারত আক্রমন করলে ভারতও মুক্তিবাহিনীর সহযোগীতায় প্রতিআক্রমন করে। ১৬ই ডিসেম্বর,‘৭১ জেনারেল নিয়াজী প্রায় ৯২,০০০ পাকিস্তানী সৈন্য নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত যৌথবাহিনীর কাছে রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পন করে। পৃথিবীর বুকে লাল-সবুজের পতাকাবাহী একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র জন্মলাভ করে।

পাকিস্তানীদের অত্যাচারে যারা ৯ মাস দেশ ত্যাগ করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল, একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায় তার হিসাব নিম্নরুপ:

পশ্চিমবাংলা ৭৪,৯৩,৪৭৪.

ত্রিপুরা ১৪,১৬,৪৯১

মেঘালয় ৬,৬৭,৯৮৬

আসাম ৩,১২,৭১৩

বিহার ৮,৬৪১ 

মোট ৯৮,৯৯,৩০৫

বাঙালি জাতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজীবুর রহমানের ডাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। তাজউদ্দিন আহমদ তাকে সুদক্ষভাবে পরিচালনা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসী ভূমিকা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগীতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করেছিল৷ ভারতের সহায়তা আমাদের জন্য অপরিহার্য ছিল। জয়ের সাথে সাথে আমরা পাকিস্তানের জেল থেকে বঙ্গবন্ধুকেও মুক্ত করেছি। এ জয় আমরা অর্জন করেছি ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, তিন লক্ষ মা-বোন অপমানিত হয়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল সারাবিশ্বের কাছে একটি অবিস্মরনীয় ঘটনা তাই বাংলাদেশ নামের এই জনপদের মানুষরা মুক্তিযোদ্ধাকে, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ও ভারতের জনগণকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে৷ 

পশ্চিমবাংলা, ত্রিপুরা, মেঘালয় ,আসাম, বিহার ,উত্তরপ্রদেশ,অরুনাচল সবাই সাদরে শরনার্থীদের স্থান করে দেয় ৷ ইন্দিরা গান্ধী সারাবিশ্বের দ্বারপ্রান্তে ঘুরে ঘুরে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে বিশ্ব-জনমত গড়ে তুলেছেন। প্রায়  সাত হাজার কোটি রুপী ব্যয় করেছেন। ভারতের ৩,৬৩০ জন জওয়ান ও অফিসার আত্মৌৎস্বর্গ করেছেন। ৯,৮৫৬ জন জওয়ান ও অফিসার আহত হয়েছেন৷ ২১৩ জন জওয়ান ও অফিসার নিখোজ রয়েছেন৷ ভারতীয় এই শহীদদের জন্যে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা ১৭কোটি বাঙালিদের বিবেচনা করা উচিত৷ 

ত্রিপুরা ও আগরতলায় শরনার্থীদের সংখ্যা স্থানীয় নাগরিকদের সংখ্যাকেও অতিক্রম করে গিয়েছিল। যেকারণে এসব অঞ্চলসমূহে খাদ্যদ্রব্য সংকট দেখা দিয়েছিল এবং চলাফেরায়ও বিঘ্ন ঘঠেছিল৷ তথাপি তারা বাঙ্গালী শরনার্থীদেরকে এবং মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অকূন্ঠচিত্তে সহযোগীতা করেন৷ ত্রিপুরা ও আগরতলাবাসীদের এই সমাদর কোনদিন ভুলবার নয়। হয়তোবা উক্ত অঞ্চলের ভাষা ও কৃষ্ঠি বাঙ্গালীদের অনুরূপ হওয়ায় ত্রিপুরা , আগরতলা ও পশ্চিমবাংলায় বাঙ্গালীরা বাঙালি স্বরণার্থীদের বরণ করে নিতে  স্বাচ্ছন্দ বোধ করেছিল।

আজ আমরা স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে এসে দাড়িয়েছি। কিন্তু ভারতবাসীর তথা পশ্চিমবাংলা, ত্রিপুরা, মেঘালয়,আসাম, বিহার ,উত্তরপ্রদেশ,অরুনাচল অঞ্চলের মানুষের উষ্ণ হৃদয়ের ছোঁয়া আর আতিথেয়তার স্মৃতি আজও অম্লান রয়েছে। যুগযুগ ধরে তা আমরা বাঙালিরা আমাদের হৃদয়ে ধারণ করবো।

লেখক: বঙ্গবন্ধু নামের প্রস্তাবক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *